একুশে বইমেলা

বিসর্জন: ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের অনন্য গল্প

ইব্রাহিম পাভেল

Advertisement

একটি বইয়ের শুরু যদি মন ছুঁয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সামনে অপেক্ষা করছে হৃদয়গ্রাহী এক গল্প। শফিক রিয়ানের ‘বিসর্জন’ তেমনই এক উপন্যাস। যার উৎসর্গপত্র পাঠককে প্রথমেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। বইয়ের প্রতিটি পাতায় লেখকের মুন্সিয়ানা স্পষ্ট—গভীর অনুভূতি আর বাস্তব জীবনের প্রতিচিত্র যেন এক সুক্ষ সুতায় গাঁথা।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দু তিন বন্ধু—রিহাদ, রাফসান ও শুভ। যদিও মেডিকেলে তারা তিনটি ভিন্ন গ্রুপে পড়ে। কিন্তু বন্ধুত্বের বাঁধন এতটাই দৃঢ় যে, একে অন্যের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। শুভর গ্রুপটি একটু ব্যতিক্রম—সেখানে সে একমাত্র ছেলে আর সবাই মেয়ে! তাই বন্ধুরা ঠাট্টা করে তাকে ‘রাজপুত্র’ বলে ডাকতো।

উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র তৃষ্ণা, যার পুরো নাম তসলিমা রহমান বিনতে সাইফুল নাঈম। রোল-১৭। শুভই তার নাম ছোট করে ‘তৃষ্ণা’ রেখেছিল। শুধু রূপে নয়, বুদ্ধিতেও সে অতুলনীয়। তার উপস্থিতি কেবল শুভর জীবনেই নয়, গল্পের গাঁথুনিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

Advertisement

শুভ—পিতামাতাহীন এক লড়াকু চরিত্র। নিজের মেধা আর অধ্যবসায়কে সম্বল করে সে এগিয়ে চলে। সহপাঠীদের কাছে তার জনপ্রিয়তার কারণ শুধু বন্ধুত্ব নয়, কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানোর দক্ষতাও। লেখক এত যত্নের সঙ্গে শুভর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়।

বাঙমান খ্যাত জাহার—এক ওমান-বাংলাদেশি তরুণ, যে বন্ধুমহলে পরিচিত ‘হাবিবির বাচ্চা’ নামে। কারণ? তার কানে সারাক্ষণ বাজে ‘ইয়া হাবিবি’ গান! লেখকের সূক্ষ রসবোধ গল্পের ভারসাম্য ধরে রাখতে দারুণ ভূমিকা রেখেছে।

আরও পড়ুন জুবায়েদ মোস্তফার কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘফুলের নৈঃশব্দ্য’ আব্দুন নূরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রক্তাক্ত রক্ত’

অন্যদিকে অভীত নামের চরিত্রটি গল্পে এক ধোঁয়াশাময় গভীরতা যোগ করেছে। তার নাম পড়তে পড়তে অনেকেই হয়তো ভুল করে ‘অতীত’ পড়বে, আর এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা। অভীতের সংলাপগুলো পাঠকের মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়।

জীবন সব সময় চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ মেনে চলে না। শুভ একজন সফল ডাক্তার হয়ে ওঠে, কিন্তু ভাগ্য তার জন্য ভিন্ন পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছিল। সম্পর্কের জটিলতা, সময়ের নিষ্ঠুর খেলা এবং বাস্তবতার নির্মম রূপ গল্পকে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলে।

Advertisement

গল্পের শেষ অধ্যায়ে এমন কিছু ঘটে, যা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সময়ের অমোঘ পরিণতি এক মোড়ে এসে মিলিত হয়। শুভর জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।

‘বিসর্জন’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি ভালোবাসা, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের প্রতিচিত্র। যারা হৃদয়ছোঁয়া গল্প ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অনবদ্য পাঠ্য।

বই: বিসর্জনলেখক: শফিক রিয়ানধরন: উপন্যাসপ্রকাশক: উপকথাপ্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদমূল্য: ৩০০ টাকা।

এসইউ/এএসএম