কৃষি ও প্রকৃতি

ঝালকাঠিতে খেসারির বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা

শস্যভান্ডার খ্যাত বরিশালের ঝালকাঠিতেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির আবাদ। সেই সাথে ডাল ও তেল জাতীয় কৃষিতেও এগিয়ে অনেক। ডালজাতীয় কৃষিতে খেসারি চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। উর্বর ফসলি জমিতে দিগন্তজুড়ে সবুজ খেসারির নীলাভ ফুলে প্রকৃতি এক অপরূপ সাজে সেজেছে। দিন দিন খেসারি ডালের চাহিদা বাড়ায় কৃষকেরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

Advertisement

এ ডাল দিয়ে তৈরি হয় নানা রকমের খাবার। বিশেষ করে রমজান মাসে এর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এ বছর রমজানের পরেই কৃষকেরা তাদের খেসারি ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। ঝালকাঠি জেলার চার উপজেলার আমন আবাদি জমিতে এ বছর খেসারি ডালের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার ৪ উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নে ৭ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমিতে খেসারি ডালের চাষ হয়েছে। বীজ বেড়ে ওঠার পরে শাক হিসেবেও খেসারি লতার কদর আছে সব মহলে। মৌসুমি এ শাকের জনপ্রিয়তা আছে গ্রাম, গঞ্জ ও শহরে। বিস্তীর্ণ আমন চাষের জমিতে এ ডাল চাষ হচ্ছে।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আমন ধান থাকা অবস্থায়ই নভেম্বর মাসে কাদাময় জমিতে বিঘাপ্রতি পাঁচ-ছয় কেজি খেসারি ডালের বীজ ছিটিয়ে দিতে হয়। এ পদ্ধতিকে রিলে ফসল চাষ পদ্ধতি বলা হয়। এ পদ্ধতির বদৌলতে কৃষকেরা সঠিক সময়ে খেসারি বীজ বুনতে পারছেন। এভাবে নভেম্বর মাসে কাদাযুক্ত জমিতে বীজ ছিটানোর কারণে ভালোভাবে গজাতে পারে। এ পদ্ধতিতে কৃষক জমি তৈরির খরচ থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন।

Advertisement

নভেম্বর মাসে বীজ বপন করে বর্তমানে ফুল থেকে ফসল আসতে শুরু করেছে। মার্চ মাসে খেসারি ফসল তোলা যায়। বেশিরভাগ কৃষক রিলে খেসারির জমিতে কোনো ধরনের সার প্রয়োগ করেন না। কিন্তু খেসারির বীজ বপনের সময় বিঘাপ্রতি ৬ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি এবং ৫ কেজি পটাশ সার জমিতে ছিটিয়ে দিলে ভালো ফলন নিশ্চিত হয়। সার ও বীজ ছিটানোর সময় খেয়াল রাখতে হয়, ধান গাছ যেন জমিতে দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে। শুয়ে পড়া ধান গাছের জমিতে রিলে খেসারি চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। গাছ ভেজা থাকা অবস্থায়ও সার ছিটানো ঠিক হবে না। জমিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ডালজাতীয় ফসল উৎপাদনের পূর্বশর্ত।

আরও পড়ুন জাপানের বাজারে শেরপুরের মিষ্টি আলু ফেনীতে রঙিন ফুলকপি ও ব্রোকলির বাণিজ্যিক চাষ

ধান কাটার সময় জমিতে অন্তত ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি নাড়া থাকে, সেই ব্যবস্থা কৃষকদের করতে হবে। জমিতে বড় বড় নাড়া থাকলে খেসারি গাছ ভালোভাবে ওপরের দিকে উঠতে পারবে। ওপরের দিকে উঠতে পারার কারণে গাছ চারদিক দিয়ে প্রচুর আলো-বাতাস পাবে এবং প্রতিটি গাছে প্রচুর ফুল-ফল আসবে। এতে ফলন অনেক বেশি হবে।

কৃষকদের ধারণা, তারা বিঘাপ্রতি ২০০ কেজিরও বেশি খেসারি ডাল পাবেন। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ হাজার টাকারও বেশি। বাজারে এখন ১ কেজি খেসারি ডালের মূল্য ৭০-৮০ টাকা। অথচ ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে খেসারি ডাল চাষাবাদে বীজ, সারসহ খরচ বিঘাপ্রতি মাত্র ১ হাজার টাকা খরচ হয়। শুধু তা-ই নয়, খেসারি গাছের শেকড়ে নডুউল তৈরি হয়, যা মাটিকে উর্বর করে। অর্থাৎ ডাল ফসল আবাদের কারণে জমির উর্বরতা শক্তিও বাড়বে। খেসারি ফসল তোলার পর ধান গাছের নাড়া জমিতে মিশিয়ে দিলেও জমির উর্বরতা বাড়বে। এতে জমির লবণাক্ততাও কিছুটা কমে যাবে। ফলে পরবর্তী সময়ে ফসল ভালো হবে।

কৃষকেরা আরও জানান, গত বছর প্রতি মণ খেসারি বিক্রি হয়েছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। এ বছর আরও দাম বাড়বে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। খেসারি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। এ ছাড়া শাক হিসেবে এর চাহিদা থাকায় অতিরিক্ত লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। গো-খাদ্য হিসেবেও শুকনা খেসারি লতার জুড়ি নেই।

Advertisement

ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় ৭ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমিতে খেসারি আবাদ হয়েছে। যার মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৬২৬ হেক্টর, নলছিটি উপজেলায় ৮৭৬ হেক্টর, রাজাপুর উপজেলায় ২ হাজার ৪৩ হেক্টর ও কাঠালিয়া উপজেলায় ২ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে খেসারি ডাল চাষ করা হয়েছে। ফুল থেকে ফসল আসতে শুরু করেছে। দেখেই বোঝা যায়, ফলনও খুব ভালো হবে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

এসইউ/এএসএম