তানজিদ শুভ্র
Advertisement
মসজিদের মাইকে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ- ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম…’ শব্দ শুনেই ধড়মড় করে উঠে বসেন মোমেন চৌধুরী। ঘুমটা ভালো হয়নি গত রাতে। ঈদের আগের রাত বলে কথা! একসময় কত ব্যস্ততায় কাটত এই রাত। চাঁদ দেখার আনন্দ, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে কুশল বিনিময়, আর ঈদের খাবারের আয়োজন।
এখন সেই ব্যস্ততা কোথায়? গত রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন তিনি। মনে মনে ভেবেছিলেন, হয়তো আজ ছেলে রুমান আর বউমা তাকে দেখতে আসবে, সঙ্গে থাকবে আদরের নাতিটা। কতদিন তাদের দেখেননি! সেই ভাবনায় ঘুমিয়েও পড়েছিলেন কখন যেন।
জেগে উঠে দেখেন, আশ্রমের ঘরের বাকিরাও ঘুমোচ্ছে। সবাইকে ডেকে তুলে নিজেও ওজু করতে বেরিয়ে পড়লেন। নামাজ শেষে আশ্রমের দক্ষিণ পাশে কবরস্থানে গেলেন সবাই মিলে। এখানে যারা শুয়ে আছে, তাদের বেশিরভাগই এই আশ্রমেরই বাসিন্দা ছিলেন। সন্তানদের কেউ এসে তাদের নিথর দেহ নিয়ে যায়নি, তাই আশ্রমের পাশেই তাদের শেষ ঠিকানা।
Advertisement
মোমেন চৌধুরী কবরের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবলেন, একদিন তিনিও এখানেই শুয়ে থাকবেন। তখনও কি ছেলে একবার দেখতে আসবে?
আরও পড়ুন: একটি আকাশের গল্প বাংলা সাহিত্য ঈদুল ফিতর মো. তৌহিদুজ্জামানের গল্প: রফুর ঈদ আনন্দফিরে এসে সকালের নাশতায় এক প্লেট সেমাই পেলেন। আশ্রমের মালিক রুবিনা হক গতকালই সবাইকে একটা করে নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা আর টুপি দিয়েছিলেন। নতুন পোশাক পরে সবাই ঈদগাহে গেলেন নামাজ পড়তে। নামাজ শেষে সবাই একসঙ্গে ফিরে এলেন।
আগে ঈদের দিনে কত আনন্দ ছিল! ছেলে, নাতি, পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেলামি নিতে লাইন ধরে দাঁড়াত। এখন সম্বল বলতে একটা বালিশ, একটা কম্বল, একটা মগ আর একটা গ্লাস।
মোমেন চৌধুরীর ছেলে যাওয়ার সময় তার প্রিয় রেডিওটা দিয়ে গিয়েছিল। সেটাই এখন সঙ্গী। তার থাকার ঘর, ১১৬ নম্বর কক্ষ, সেখানেও তার মতো আরও তিনজন আছেন, যাদের কেউ দেখতে আসে না।
Advertisement
বাকিরা সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছেন। উৎসব আসে, যায়… কেউ আসে না। কিন্তু মোমেন চৌধুরী আজও অপেক্ষায়। তিনি বিশ্বাস করেন, ছেলে আসবে।
অপেক্ষার ফাঁকে পুরনো পত্রিকা হাতে নিলেন তিনি। আজ ঈদ বলে নতুন পত্রিকা আসেনি। চোখে পড়ে একটা শিরোনাম- ‘অসহায়দের পাশে দাঁড়ালেন বিশিষ্ট শিল্পপতি রুমান চৌধুরী’। হতবাক হয়ে পড়লেন মোমেন চৌধুরী। সংবাদে লেখা, তার ছেলে বস্তির গরিব-দুঃখীদের মাঝে ঈদ পোশাক আর খাবার বিতরণ করেছেন।
মোমেন চৌধুরীর বুকটা হু হু করে উঠল। নিজের বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে সে এখন অসহায়দের পাশে দাঁড়ায়? তার চেয়ে বেশি অসহায় আর কে আছে?
কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাগুলো সরিয়ে দিলেন। সন্তানের জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ করলেন, ‘আল্লাহ, আমার ছেলে যেন আরও বড় হয়, আরও সমাজসেবা করে।’
দুপুরের খাওয়ার পর মোমেন চৌধুরী রেডিও চালু করলেন। ভেসে এল নচিকেতার গান- ‘বৃদ্ধাশ্রম’। গান শুনে আর চোখের জল আটকাতে পারলেন না। নিজের জীবনের চিত্র যেন মিলে গেল গানের কথার সাথে।
তিনি ভাবেন, ছেলের বিশাল ফ্ল্যাটে তার জায়গা হলো না, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমের এই ছোট্ট ঘর তাকে জায়গা দিল। একদিন কি ছেলেও তার জায়গায় এসে আশ্রমে ঠাঁই নেবে? নাতিটা কি তার বাবাকেও ঠিক এমনভাবেই ফেলে যাবে?
এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খায়, চোখ বেয়ে নীরব জল গড়ায়।
দিনশেষে সন্ধ্যা নামে। কুটিরে বাতি জ্বলে। কিন্তু মনের অন্ধকারে আলো জ্বলে না। সন্তান আর আসে না। আজও আসেনি। কিন্তু আশায় বুক বাঁধা মোমেন চৌধুরী জানালায় চেয়ে থাকেন, ‘হয়তো একদিন ছেলে, বউমা, নাতি… সবাই আসবে!’
জেএস/এএসএম