হাত ছুঁই ছুঁই করে থাকা আকাশটা যেন ডাক দিচ্ছিল। ১৯৩৭ সালের এক সকালের কথা। প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন এক নারী, তার চোখে স্বপ্ন, হৃদয়ে সাহস। নাম তার অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। তিনি একজন নারী, যিনি শুধু প্লেন চালাননি, চালিয়েছেন নারীর স্বাধীনতা, সাহস ও স্বপ্নের উড়ান। অতঃপর? অতঃপর.........
Advertisement
তাকে নিয়ে গল্প শুরু করলে মনে হয়, যেন কোনো উপন্যাসের নায়িকা। ছোটবেলা থেকেই নিয়ম ভেঙে চলতে ভালোবাসতেন। ছুটে চলতেন, গাছ বেয়ে উঠতেন, আর সবার মতো মাটিতে পা রেখে হাঁটার বদলে আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতেন।
১৮৯৭ সালের ২৪ জুলাই কানসাসের অ্যাটচিসনে জন্ম নেওয়া অ্যামেলিয়া যেন জন্ম থেকেই অন্যরকম ছিলেন। বাবা ছিলেন রেলওয়ের কর্মী, মা চেয়েছিলেন মেয়েরা যেন সমাজের গৎবাঁধা নিয়মে না চলে। মা-মেয়ের এই দারুণ বোঝাপড়াই অ্যামেলিয়াকে গড়ে তোলে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে।
১৯২০ সালে এক বিমান মেলায় প্রথমবারের মতো প্লেন দেখেন অ্যামেলিয়া। সেই এক মুহূর্তই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাত্র ১০ মিনিট প্লেনে ওড়ার পরই তিনি ঠিক করেন, এটাই তার পথ। তিনি তখনকার সমাজের প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক বাধা সব কিছু পেছনে ফেলে নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরলেন।
Advertisement
তখনকার দিনে প্লেন চালানো মানে শুধুই সাহস নয়, ছিল বিপদের নামান্তর। আর নারী হিসেবে সেটা ছিল দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অ্যামেলিয়া ভয় পাননি। তিনি ছিলেন আমেরিকার প্রথম নারী, যিনি একা আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে উড়েছেন। ১৯৩২ সালের সেই ঐতিহাসিক ফ্লাইট তাকে রাতারাতি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়। তার কথায়, ‘নারীরা যদি চায়, তারা যে কোনো কিছু করতে পারে।’
অ্যামেলিয়ার সাফল্য শুধু আকাশে উড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন নারীদের অধিকার আদায়ের অন্যতম কণ্ঠস্বর। তিনি নারীদের উৎসাহ দিতেন, যেন তারা সাহস করে নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেয়। তিনি হয়তো এটাই ভাবতেন, কাজে সাহস না থাকলে জীবন অনেকটা স্বাদহীন হয়ে যায়।
১৯৩৭ সালে শুরু হয় তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। পৃথিবীকে ঘিরে উড়ার মিশন। বিশ্বকে এক ফাঁসির মতো বেঁধে ফেলতে চেয়েছিলেন আকাশপথে। তার সঙ্গে ছিলেন নেভিগেটর ফ্রেড নুনান। সব ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু ২ জুলাই, যখন তারা হাওল্যান্ড দ্বীপের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপরই পৃথিবী হারিয়ে ফেলে তার আকাশকন্যাকে। এক বিশাল অনুসন্ধান চালানো হয়, কিন্তু অ্যামেলিয়া আর ফিরে আসেননি।
তার নিখোঁজ হওয়া যেন এক রহস্য। কেউ বলেন, তিনি হয়তো বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কেউ বলেন, তিনি হয়তো কোনো দ্বীপে বন্দি হয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তিনি হয়তো বেঁচে ছিলেন, লুকিয়ে ছিলেন কারো সহানুভূতির আশায়। কিন্তু সত্যটা আজও হারিয়ে আছে মহাসাগরের অসীম নীল জলে।
Advertisement
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট নিখোঁজ হয়েছেন, ঠিকই। কিন্তু তার গল্প, তার সাহস, তার স্বপ্ন আজও অমলিন। প্রতিটা সাহসী নারীর চোখে, প্রতিটা স্বপ্নবাজ মানুষের মনে তিনি বেঁচে আছেন। আকাশ পেরিয়ে যাওয়া সেই নারী যেন প্রমাণ করে গেছেন স্বপ্নের কোনো সীমা নেই, আর সাহস কখনো হারায় না।
আজও যখন কেউ নতুন কিছু শুরু করতে ভয় পায়, অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট যেন ফিসফিস করে বলেন, ‘যদি তুমি স্বপ্ন দেখো, তবে উড়তে শেখো। কারণ আকাশ শুধু পাখিদের না, সাহসীদের জন্যও।’ এভাবেই এক হারিয়ে যাওয়া আকাশকন্যা বেঁচে থাকেন ইতিহাসের পাতায়, আর আমাদের হৃদয়ে।
আরও পড়ুন
কয়লা শ্রমিকের ঘামে জ্বলে উঠে শহরের বাতি ৯০ দশকের ছেলেমেয়ের স্মৃতিতে আজও সতেজ টমটম গাড়িতথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম, দ্য অফিসিয়াল অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট, হিস্টরি ডট কম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
কেএসকে/এমএস