এনামুল হক বিজয় নিজেকে খানিক দুর্ভাগা ভাবতেই পারেন। ক্যারিয়ারের প্রথম ২০ ওয়ানডেতে হাঁকিয়েছিলেন তিন-তিনটি সেঞ্চুরি। যা ছিল না বাংলাদেশের কোন ব্যাটারের। আজ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের শুরুতে ২০ ম্যাচে অতগুলো সেঞ্চুরি করতে পারেননি কোন বাংলাদেশি ব্যাটার।
Advertisement
তারপরও এনামুল হক বিজয়ের ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ হয়নি। জাতীয় দলে তার জায়গা কখনোই পাকাপোক্ত হয়নি। উপেক্ষার মালাই গলায় পড়েছেন বারবার। তার যেখানে থাকার কথা ছিল, তিনি সেখানে নেই।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম করেও জাতীয় দলে আজও উপেক্ষিত। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রচুর রান করেও প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে (২০২২ সালের জুনের পর থেকে) টেস্ট দলের বাইরে। দেশের একমাত্র ৫০ ওভারের আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে গত ২ বছরে প্রায় দেড় হাজার রান (২০২৩ সালে ৩ সেঞ্চুরিসহ ৮৩৪ ও ২০২৪ সালে ২সেঞ্চুরিতে ৫৬৩ রান) করার পরও ওয়ানডে দলে সেভাবে জায়গা পাননি।
সাকুল্যে ৫টি ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েছেন। একইভাবে গত বিপিএলে প্রায় ৪০০ রান (১২ ম্যাচে একটি সেঞ্চুরিসহ ৩৯২) করেও গত আড়াই বছর ধরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আর বিবেচনায় আসেননি। তারপরও হতোদ্যম না হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে সব ফরম্যাটে দুর্বার এনামুল হক বিজয়। তার ব্যাট থেকে রানের নহর বয়ে যাচ্ছে। গন্ডায় গন্ডায় সেঞ্চুরি করছেন।
Advertisement
এবারের প্রিমিয়ার লিগে এখন পর্যন্ত ৮ ম্যাচে একজোড়া সেঞ্চুরি হাঁকানোসহ ৫৩০ রান করে রান তোলায় সবার ওপরে বিজয়।
ক্যারিয়ারের এ পর্যায়ে কি তার ভাবনা? নিজের সম্পর্কে তার মূল্যায়নটাই বা কি? তিনি কি তার মেধা ও সামর্থ্যের প্রকৃত মূল্যায়ন পেয়েছেন? তার যেখানে থাকার কথা ছিল, তিনি কি সেখানে আছেন? জাতীয় দলে উপেক্ষিত হয়েও ঘরোয়া ক্রিকেটে এত ভাল খেলার অনুপ্রেরণাই বা পান কোথা থেকে?
এসব নিয়ে জাগো নিউজের সাথে খোলামেলা আলাপে অনেক কথা বলেছেন এনামুল হক বিজয়। আসুন তা শোনা যাক...।
জাগো নিউজ: সময়টা খুব ভাল কাটছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে রান পাচ্ছেন। প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে এখন পর্যন্ত টপ স্কোরার। দুটি সেঞ্চুরিসহ নামের পাশে ৮ ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরিসহ ৫৩০ রান। আপনার বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। এর পিছনের গল্পটা কি, একটু বলবেন?
Advertisement
বিজয়: না, আসলে এ বছর প্রিমিয়ার লিগের অবস্থা ছিল অন্যরকম। সবার পেমেন্ট প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুরুতে সংশয় ছিল সবার মনেই। এবারের প্রিমিয়ার লিগ কিভাবে হবে? কেমন হবে? আমি নিজেও আবাহনী থেকে গাজী গ্রুপে এসে খানিকটা সংশয়ে ছিলাম। যখন গাজী গ্রুপ আমাকে কনফার্ম করে তখন ভেবেছি কেমন হবে দলের পরিবেশ?
কিন্তু এক দুইটা ম্যাচের পরই দলের অন্য ক্রিকেটারদের সাথে খুব ভাল প্রীতির সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। তারা সবাই খুব আন্তরিক। কোচ হিসেবে উজ্জ্বল ভাইকে দায়িত্ব দেয়া হয় দল পরিচালনার জন্য। সবাই ট্যালেন্টেড পারফরমারও। সবার মন-মানসিকতা ভাল। কোচও ভাল। সব মিলে একটা চমৎকার একটা হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ। ওদের সাথে থাকা ও খেলাটাও আমার ভাল খেলার পিছনে একটা বড় কারণ। টিমটার পরিবেশ খুব চমৎকার। সেটাও হেল্প করেছে। এ বছরটা আসলে আল্লাহর রহমতে আমার ভালই কাটছে। বিপিএল ভাল গেছে। এনসিএলে রান পেয়েছি। সবই মোটামুটি ভালই গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রিমিয়ার লিগে পারফরম করা।
জাগো নিউজ: বিপিএল, এনসিএল ভাল কেটেছে। প্রিমিয়ার লিগে আছেন ফর্মের তুঙ্গে। আপনার ব্যাট যেন খোলা তরবারি। এত ভাল খেলার পিছনের কাহিনী কী? সেটা কি শুধুই প্রসেস মেনে চলা? নাকি নিজেকে মেলে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা। সংকল্প বা কোন জেদ?
বিজয়: আসলে জেদ বা নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছে থেকেই যে ভাল খেলা তা বলবো না।
জাগো নিউজ: তাহলে আপনার নিজেকে মেলে ধরার ইচ্ছেটা এত প্রবল কেন? এটা কি তবে ক্রিকেটকে ভালবেসেই। নিজেকে উপস্থাপনের কোন ইচ্ছে কি নেই?
বিজয়: আমি বিজয়, আমার যে সামর্থ্য আছে, আমার যে ক্যাপাসিটি বা ক্যাপাবিলিটি আছে, অ্যাবিলিটি ও যে ট্যালেন্ট আছে- আমার ক্রিকেট বোধ-বুদ্ধি ও সর্বোপরি পারফর্ম করার যে ক্ষমতা তার সবটুকুই আসলে আমার দেশকে দেয়ার জন্যই। আসলে সেটাই থাকে আমার লক্ষ্য। যখনই খেলি তখনই মনে হয় আগের বছরের চেয়ে আমি নিজেকে আরও উন্নত করতে পারলাম কি না? সেটা শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য না। সেটা ন্যাশনাল টিমের জন্যও থাকে।
জাগো নিউজ: আপনার কি মনে হয় আপনার যেখানে থাকা উচিৎ ছিল, আপনি সেখানে আছেন?
বিজয়: নাহ নেই। আমার যেখানে থাকা উচিৎ ছিল, ঘুরিয়ে বললে যেখানে আমি থাকার যোগ্য; সেখানে আমি নেই। আমি ছিলাম না। আমি ওই পজিশনটা পাইনি। আমাকে সেখানে থাকার সুযোগ দেয়া হয়নি। আমি নির্দিধায় ওপেন ফোরামেই তা জোর দিয়ে বলতে পারি। আমার যে সামর্থ্যটুকু আছে, সেটা আসলে বাংলাদেশকে দেয়ার জন্য। আমি কি পারি না পারি, সেটা আসলে আমি জানি; কিন্তু মনে হয় আমি নিজেকে মেলে ধরার যথেষ্ঠ সুযোগ পাইনি।
জাগো নিউজ: সেটা কেন, কি কারণে আপনি যথেষ্ঠ সুযোগ পাননি। এর জন্য বিশেষ কেউ বা কোন প্রক্রিয়াকে দায়ী করতে চান? আপনি জাতীয় দলে যে পরিমাণ সুযোগ পেয়েছেন, সেটা কি যথেষ্ঠ ছিল? আপনার কি কম বলে মনে হয় না?
বিজয়: না, না অবশ্যই মনে হয়। সেটা কোন ডাউট ছাড়াই বলা যায়। আমি অনেক কম সুযোগ পেয়েছি বা আমাকে অনেক কম সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা বলতে আমার কোন দ্বীধা নেই। আমার মনে হয় এটা নিয়ে কারো কোন সংশয়, সন্দেহও থাকার কথা না।
আমার মনে হয় কারো সাথে কারো তুলনা করা ঠিক না। কোনো দলের কেউ সেই দলেরই আরেক জনের মত না। একেকজন একেক রকম। বাংলাদেশ দলকে আমরা চাই ভিন্ন পথে হাটাতে। আমরা সবাই চাই সব ক্রিকেটার এক ও অভিন্ন চরিত্রের ও আদলের হবে। সবাই একই রকম হবে। আসলে তা হবার না। তা হয় না। পৃথিবীর কোন দেশেই তা নেই। যে যার মত করে জেতাতে পারতেছে কি না!
সেটার প্রতি আমাদের নজর কম। আমরা তা বাদ দিয়ে ক্যারেক্টার খুঁজতে থাকি, সবাই একরকম হবে না। আমি মনে করি আমি পর্যাপ্ত সুযোগ পাইনি। যে পরিমাণ সুযোগ পাওয়া উচিৎ, তাতো পাইনি। তারচেয়ে অনেক কম পেয়েছি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আমার ৯ হাজার রান। অথচ টেস্ট খেলেছি মাত্র ৫টা। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে আমার বিপিএলের রান সংগ্রহকারীদের তালিকায় তিন নম্বরে; কিন্তু আমাকে সেভাবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বিবেচনায় আনা হয়নি। আমি কন্টিনিউ করতে পারিনি।
তারপরও আমাকে শুনতে হয় আমি নাকি ‘ডমিস্টিক প্লেয়ার।’ অথচ আমিতো ন্যাশনাল টিমেও পারফরম করেছি এবং করে আসছি। এই ট্যাগলাইন যখন এই কান ওই কান হয়ে অন্যরকম ইমপ্যাক্ট ফেলে। আমার মনে হয় আমি পর্যাপ্ত সুযোগ ডিজার্ভ করি। এখনো করি। এটা আমার জন্য অবশ্যই ভাল। আমার মনে হয়, আমি ফর্মে থাকা অবস্থায় জাতীয় দলে খেললে আমার দেশ ও জাতীয় দলের জন্যও ভাল। কারণ ইনফর্ম প্লেয়ার জাতীয় দলে খেললে দলেরই মঙ্গল।
এআরবি/আইএইচএস/