চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে দাম না পাওয়ায় ক্ষেতে নষ্ট হচ্ছে টমেটো। বাজারে প্রতি কেজি টমেটো পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৩-৫ টাকায়। ফলে টমেটো বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না কৃষক। তাই ক্ষেত থেকে টমেটো তুলছে না চাষিরা। চাষিদের অভিযোগ দুই উপজেলায় হিমাগার থাকলে এভাবে ক্ষেতে নষ্ট হতো না টমেটো।
Advertisement
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে মিরসরাইয়ের ১৬ ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় ১৩০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ হয়েছে। ১৩০ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত টমেটোর পরিমাণ পাঁচ হাজার ৩৩০ হেক্টর। উৎপাদিত টমেটোর বাজার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।
সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, এবার সীতাকুণ্ডে ৫৮০ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার ১৮৫ মেট্রিক টন। এ বছর তাপমাত্রা অনুকূলে থাকায় ফলন ভাল হয়েছে। তবে ভালো দাম না পাওয়ায় কৃষকেরা হতাশ।
সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী এবার সাড়ে তিন একর জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। এ জমিতে চাষাবাদে তার খরচ পড়েছে ১২ লাখ টাকা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তিনি টমেটো বিক্রি করেছেন মাত্র চার লাখ টাকার। এর মধ্যে টমেটোর দাম কমেছে হুর-হুর করে। অবস্থা এমনই যে মাঠ থেকে টমেটো তুলে বাজারে আনতে যে খরচ, বিক্রি করলে তাও উঠছে না। ফলে ক্ষেত থেকে টমেটো তুলতে আগ্রহ হারিয়েছেন তিনি। এতে বড় অংকের টাকা লোকসানের আশংকায় ভুগছেন এ কৃষক। এ অবস্থা শুধু গুলিয়াখালী গ্রামের নয়, পুরো উপজেলার।
Advertisement
ক্ষেত থেকে টমেটো তুলে বাজারে নিয়ে যেতে যে খরচ, তা উঠবে না বলে টমেটো তুলছেন না কৃষক মো. কাসেম, নুর নবীসহ আরও অনেকে। তারা বলেন, টমেটো তুলতে শ্রমিক মজুরি লাগে, একটা পিকআপ কিংবা ভ্যানে নিয়ে যেতে হয় বাজারে। তোলা এবং বাজারে নিয়ে যেতে যদি ৮০০ কিংবা এক হাজার টাকা খরচ হয়। তবে সেখানে নিয়ে বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। তাই আমরা তোলা ছেড়ে দিয়েছি। আবার হিমাগার না থাকায় সংরক্ষণ করেও রাখতে পারি না।
আইয়ুব আলী নামের এক কৃষক বলেন, লাভের আশায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১৫০ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছিলাম। পাইকারি ৩-৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ উঠছে না।
মিরসরাই উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের মধ্যম আজমনগর গ্রামের কৃষক লিপি আক্তার বলেন, চলতি বছর আমি মধ্যম আজনগর এলাকার ২০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছি। আমার স্বামী সেলিম উদ্দিন বাইরে কাজ করায় আমি টমেটো ক্ষেত পরিচর্যা করে থাকি। ফলস ভালো হলেও উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এক খাঁচি (২০ কেজি) টমেটো বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকা। কিন্তু টমেটোগুলো তুলে বাজারে নিয়ে যেতে খরচ হয় প্রায় ১৫০ টাকা। তাই ক্ষেত থেকে টমেটো তুলছি না।
ধুম ইউনিয়নের মধ্যম ধুম এলাকার কৃষক আবুল কাশেম বলেন, টমেটোর কথা বলে আর লাভ নাই। এখন টমেটো বিক্রি হচ্ছে না। তাই ক্ষেত থেকে তুলছি না। অনেকে ক্ষেত থেকে নিয়ে গিয়ে খাচ্ছে, এটাই ভালো। আমি প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছি। প্রথমে ভালো দাম পেয়েছি। এখন দাম নাই।
Advertisement
জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্যম সোনাপাহাড় এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি ২০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছি। এখনো উৎপাদন খরচ তুলতে পারিনি। বৃহস্পতিবার ৮০ কেটি টমেটো বিক্রি করেছি ২৮০ টাকায়। অথচ টমেটোগুলো তুলে বাজারে নিয়ে যেতে খরচ হয়েছে ২২৫ টাকা।
সরেজমিনে উপজেলার হিঙ্গুলী, জোরারগঞ্জ, ধুম, ইছাখালী, ওসমানপুর, করেরহাট ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষেতে লাল টমেটো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে। অনেক ক্ষেতে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে টমেটো। আবার অনেকে টমেটোসহ গাছগুলো উপড়ে ফেলেছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, টমেটোর দ্বিগুণ উৎপাদনের কারণে দাম একেবারেই কমে গেছে। যদি উপজেলায় হিমাগার থাকত, তাহলে অতিরিক্ত টমেটো সংরক্ষণ করা যেত।
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, এ বছর মিরসরাইয়ে ১৩০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ হয়েছে। বর্তমানে টমেটোর দাম কমে যাওয়া কৃষকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি হিমাগার থাকলে মিরসরাইয়ের কৃষকরা অনেক লাভবান হতো।
এম মাঈন উদ্দিন/আরএইচ/এএসএম