দেশজুড়ে

চক্ষু-মেডিসিনের চিকিৎসক নেই, সরবরাহ বন্ধ জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের

নানা সংকটে ভুগছে রাজবাড়ীর আধুনিক সদর হাসপাতাল। কয়েকমাস ধরে নেই মেডিসিন ও চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক। এতে অন্য বিভাগের চিকিৎসক দিয়ে মেডিসিনের সেবা কোনোরকম চললেও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে চক্ষু সেবা। এছাড়া সরবরাহের অভাবে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এতে চিকিৎসা নিতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। তারা দ্রুত এসব সমস্যার সমাধানের দাবি করেন।

Advertisement

জানা যায়, এ হাসপাতালে জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নতিকরণে ভবন নির্মানের কাজ চলছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে আউটডোর ও ইনডোরে হাজারেরও বেশি রোগী আসেন। কিন্তু চার মাস ধরে নেই মেডিসিন ও চক্ষু বিষয়ক চিকিসৎক। পাশাপাশি নেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন। এতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না রোগীরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে মেডিসিন চিকিৎসক না থাকায় এ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন গড়ে তিন শতাধিক রোগী হাসপাতালে এলেও যথাযথ সেবা পাচ্ছেন না। এ পদে থাকা ডাক্তার গত বছরের নভেম্বরে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেলে পদটি শূন্য হয়। এরপর থেকে কার্ডিওলোজি বিভাগের চিকিৎসক দিয়ে মেডিসিনের সেবা চলছে। অন্যদিকে গত জানুয়ারি থেকে হাসপাতালে নেই চক্ষু রোগের চিকিৎসক। চক্ষু বিভাগে দুজন জুনিয়র কনসালটেন্টকে পদায়ন করা হলেও গত ডিসেম্বরে একজন ও জানুয়ারিতে একজন বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে চক্ষু রোগীদের চিকিৎসা। এতে রোগীরা সেবা নিতে এসে বিপাকে পড়ছেন। চিকিৎসক থাকা অবস্থায় চোখের সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগী সেবা পেতেন বলে জানা যায়।

আরও পড়ুন:

Advertisement

অভাবে হাসপাতাল, সেবায় জোড়াতালি দুই অ্যাম্বুলেন্সের এক চালক, সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা

এদিকে সাপ্লাই না থাকায় চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে হাসপাতালে নেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন (রেবিস ভ্যাকসিন)। ফলে কুকুর, বিড়াল ও ইঁদুরে কামড়ানো রোগীরা হাসপাতালে এসে বিড়ম্বনায় পড়ছেন। ভ্যাকসিন নিতে হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক রোগী আসছেন বলে জানা যায়। হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীদের চারজনে মিলে একেকটি ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে। পরে চিকিৎসক সেই ভ্যাকসিন দিচ্ছেন। অনেক গরীব রোগীর কাছে টাকা না থাকায় ভ্যাকসিন না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে জানা গেছে।

ভ্যাকসিন নিতে আসা নাঈম, ইমন হোসাইন ও আবুল কালাম মোল্লাসহ কয়েকজন বলেন, ভ্যাকসিন নিতে এসে আমরা সরকারি ভ্যাকসিন পাচ্ছি না। এখান থেকে বলা হচ্ছে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সাপ্লাই নাই। ফলে বাধ্য হয়ে চারজন একসঙ্গে হয়ে টাকা তুলে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে নিতে হচ্ছে। এভাবে সরকারি হাসপাতালে এসে আমরা সেবা না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। অনেকের কাছে টাকা না থাকায় ভ্যাকসিন না নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। দ্রত ভ্যাকসিন সরবরাহ করে জনগণের ভোগান্তি দূর করার দাবি জানাচ্ছি।

চোখের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসা শামীম রেজা ও সালেহসহ কয়েকজন বলেন, সরকারি হাসপাতালে সেবা নাই বললেই চলে। অনেক রোগেরই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাই। চোখের ডাক্তার দেখাতে এসে ফিরে যাচ্ছি। এরআগেও এসে ফিরে গেছি। জানলাম কয়েক মাস এই পদে কোনো ডাক্তার নাই। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চক্ষু চিকিৎসকের পদই নেই। বাইরে বেসরকারিভাবে দেখাতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু এত টাকা দিয়ে দেখানো সম্ভব না। সরকারি হাসপাতালে আসি একটু সুবিধার জন্য। কিন্তু এখানে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।

আরও পড়ুন:

Advertisement

অ্যানেসথেসিয়ানের অভাবে অপারেশন চলছে ধার করা ডাক্তারে দেড় যুগেও হাসপাতাল জোটেনি কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের

সেবা নিতে আসা রবিউল ইলসাম রবি, শরিফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন চুন্নু বলেন, এটা আধুনিক সদর হাসপাতাল বলা হলেও কতটা আধুনিক তা বলা মুশকিল। গত কয়েক মাস এই হাসপাতালে মেডিসিন ও চক্ষু রোগের চিকিৎসক নাই। কুকুর, বিড়াল, ইঁদুরে কামড়ানো রোগের ভ্যাকসিন নাই। অথচ পুরো জেলার মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালে মেডিসিন ও চক্ষু চিকিৎসক খুবই জরুরি।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আক্তার পারভিন বলেন, যখন ভ্যাকসিনের সাপ্লাই ছিল তখন সব উপজেলার রোগীরা এখানে আসতো। গড়ে প্রতিদিন দেড়শ থেকে ১৯০ জন রোগীও এসেছে। ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ থেকে সরকারি ভ্যাকসিন সাপ্লাই না থাকায় দিতে পারছি না। এখনও গড়ে প্রতিদিন ১৩০ থেকে প্রায় দেড়শ রোগী আসছেন। ভ্যাকসিন না থাকার বিষয়টি হাসপতাল কর্তৃপক্ষসহ ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন রোগীরা এলে চারজন মিলে একটি ভ্যাকসিন কিনে আনতে বলা হয়। তারা কিনে আনার পর আমরা পুশ করে দিচ্ছি। ভ্যাকসিন না পেয়ে অনেকে আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, কয়েক মাস হলো হাসপাতালে মেডিসিনের একজন ও চক্ষু রোগের দুইজনসহ তিনজন ডাক্তার বদলি হয়ে গেছেন। চক্ষু চিকিৎসক না থাকায় অপারেশনসহ চক্ষু রোগীদের সবধরনের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। মেডিসিন চিকিৎসক না থাকায় কার্ডিওলোজি চিকিৎসক দিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সেবার মান বাড়াতে হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে চক্ষু ও মেডিসিন চিকিৎসক প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে হাসপাতালে ভ্যাকসিন নাই। একটা ভ্যাকসিন চারজন নেওয়া যায় বিধায় চারজনের গ্রুপ করে দেওয়া হয়। পরে তাদের কিনে আনা ভ্যাকসিন দিয়ে কার্যক্রম চলছে। সরকারিভাবে সাপ্লাই না থাকলেও কার্যক্রম চলমান আছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানিয়েছি। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে।

এমএন/এমএস