সময়ের পরিক্রমায় কমছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা। এতে হারাতে বসেছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাসী মৃৎশিল্প। ঈদ ও নববর্ষ উৎসব কেন্দ্রিক কিছুটা চাহিদা থাকলেও সারা বছর তেমন বিক্রি হয় না মাটির তৈরি সামগ্রী। এর মাঝে কাঁচামালের উচ্চমূল্যসহ নানা প্রতিকূলতায় কুমারদের অবস্থা সংকটাপন্ন। শুধু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ পেশাকে আঁকড়ে আছেন তারা।
Advertisement
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কুমারপাড়ার কুমারদের সঙ্গে কথা হলে তারা এ চিত্র তুলে ধরেন। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে বিগত সময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েও পাননি বলে জানান তারা। আগামী দিনে প্রায় বিলীনের পথে থাকা এ শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি সহযোগিতার দাবি তাদের।
উপজেলার সবচেয়ে বড় কুমারপাড়া করেরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ছত্তরুয়ায়। এ কুমারপাড়া ঘুরে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কুমারদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ সেই মাটি ছাঁচে দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করছেন। কেউ খেলনা তৈরি করছেন কেউবা শুকানোর পর তৈজসপত্রে রংতুলির আঁচড় দিচ্ছেন। এভাবে ভোরের আলো ফোটার পর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাদের কর্মব্যস্ততা। এসব কাজ একসঙ্গে পাশাপাশি বসে করেন পরিবারের সদস্যরা।
বছরের অন্য সময়ে মৃৎশিল্পের কদর না থাকলেও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মাটির তৈজসপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করেন মৃৎশিল্পীরা। কুমারদের তৈরি সামগ্রীর মধ্যে মাটির দোয়েল, কচ্ছপ, মাছ, পুতুল, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, টিয়া, সিংহ, হাঁসসহ নানা রকম ফল, ফুল, বাহারি মাটির ব্যাংক, মগ, গ্লাস, প্লেট, চায়ের কাপ ও পিঠা তৈরির ছাঁচও উল্লেখযোগ্য। মৃৎশিল্পীরা সারা বছর মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও নববর্ষে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসার কারণে বাহারি সব খেলনা তৈরি করেন।
Advertisement
পাড়ার বাসিন্দাদের মতে, আগের মতো এখন মাটির জিনিসের তেমন কদর নেই। সারা বছর টানাপোড়েনের মধ্যে চলে তাদের সংসার। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শিকড়ের টানে এই পেশা তারা ইচ্ছে হলেও ছাড়তে পারেন না। মিরসরাই উপজেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছত্তরুয়া কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পের খ্যাতি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ পথচলায় এই খ্যাতিও এখানকার শিল্পীদের জীবনমান বদলাতে পারেনি। দারিদ্র্যতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে তারা পূর্বপুরুষের পেশাকে এখনো আঁকড়ে রেখেছেন। মৃৎশিল্পের জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার এঁটেল মাটি। কিন্তু এখন মাটি পাওয়া সহজতর নয়, এছাড়া বেড়েছে মাটি সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়। সে অনুযায়ী উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়েনি। ব্যবহারিক জীবনে এখন মৃৎশিল্পের তেমন আর ভূমিকা নেই, যা আছে তাও খুবই নগন্য। এ পেশায় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত না হওয়ায় বর্তমানে টিকে থাকা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: উদ্যোগের অভাবে মৃতপ্রায় মৃৎশিল্প সুদিন হারিয়েছে ঐতিহ্যের মৃৎশিল্পজানা যায়, সব ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের ফলে আগের রমরমা অবস্থা হারিয়ে যেতে বসেছে কুমারপাড়ায়। একসময় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের বিকল্প ছিল না। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া ও মানুষের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মাটির তৈরি সামগ্রীর স্থান দখলে নিয়েছে প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের নানা সামগ্রী। বাজারে চাহিদার স্বল্পতা, কাঁচামালের চড়া মূল্য ও পুঁজির অভাবে টিকতে না পেরে সংকটে রয়েছেন মৃৎশিল্পীরা। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে কুমারদের নতুন প্রজন্ম এখন ভিড়তে শুরু করেছেন অন্য পেশায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হাজার বছরের হতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই শিল্প বাঁচতে পারে বলে মত স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন জানান, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা খুবই প্রয়োজন। এক সময় এই কুমারপাড়ায় মৃৎশিল্পের রমরমা ব্যবসা ছিল। এ শিল্পের পুরনো ঐতিহ্য ও এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
কুমারপাড়ার নক্ষত্র কুমার পালের স্ত্রী নিহার বালা পাল বলেন, আমার বয়স প্রায় ৫০ ছুঁইছুঁই। বিয়ের পর থেকে এ পেশার সঙ্গে আমি জড়িত। আগে মাটির সামগ্রীর প্রচুর চাহিদা থাকলেও এখন আর তেমন নেই। এই শিল্পের সঙ্গে আমাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল।
Advertisement
কুমারপাড়ার লিটন কুমার পালের স্ত্রী শুক্লা রানী পাল বলেন, মৃৎশিল্প আমাদের জীবিকার প্রধান উৎস। আমাদের আর কোনো আয়ের উৎস নেই। আমরা যে চাষাবাদ করে খাবো, সেই জমিটুকুও নেই। আমার মা এই পেশায় জড়িত ছিলেন। আমার শাশুড়ির পরিবারও এ পেশায় জড়িত। ছোটবেলা থেকে আমরাও জড়িয়ে পড়েছি এই শিল্পের সঙ্গে। মৃৎশিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ এঁটেল মাটি, রং, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি এখন ব্যয়বহুল। এসব প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বেঁচে থাকতে যারা ধরে রেখেছেন মৃৎশিল্প কুষ্টিয়ার মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল যাচ্ছে বিদেশেদিপালী রানী পাল বলেন, এখন মাটির জিনিসের তেমন কদর নেই বললেই চলে। সারা বছর টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে আমাদের সংসার চলে। পূর্বপুরুষের পেশা হওয়ায় ইচ্ছা হলেও ছাড়তে পারি না। বিশেষ করে ঈদ ও বৈশাখী মেলায় মাটির তৈরি খেলনা ও জিনিসপত্রের চাহিদা থাকে। এই সময়ে ভালো আয় হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন পাল বলেন, বর্তমানে মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ মাটি নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সব ধরনের মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করা যায় না। অন্য জায়গা থেকে মাটি কিনে আনার সময় পুলিশ গাড়ি আটকে রাখে। বিষয়টি কয়েক বছর আগে আমরা তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিতভাবে জানিয়েছি। মাটি ও পুঁজির যোগান দিতে স্বল্প সুদে ঋণের জন্য একটি আবেদনও দেওয়া হয়েছে।
ছত্তরুয়া মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি মৃদুল চন্দ্র পাল বলেন, একাধিকবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি আবারো আবেদন করেছি। সরকারি অবহেলার কারণে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না এই পেশায় জড়িতরা। ফলে অচিরেই বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এই শিল্পের। কেবলমাত্র পূর্বপুরুষের পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই এখনও কুমররা শত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে মৃৎশিল্প ধরে রেখেছেন।
মিরসরাইয়ের ইউএনও মাহফুজা জেরিন জানান, কুমারপাড়ার বাসিন্দাদের সংকটের কথা আমি জানতাম না। উনারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে মাটির সংকটসহ বিরাজমান সমস্যাসমূহ যতটুকু সম্ভব তা নিরসনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
এম মাঈন উদ্দিন/এমএন/এএসএম