জুলাই আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থী ওয়াসিম, শান্ত, হৃদয় চন্দ্র তরুয়াসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র আজম ম নাসির, সাবেক সিটি মেয়র রেজাউলসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
Advertisement
এ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রসিকিউশনের করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। প্রসিকিউশন পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর শহিদুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, ব্যারিস্টার মইনুল করিম প্রমুখ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর ও মুরাদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার ওপর হামলা এবং গুলি চালায়। এ ঘটনায় ছাত্রদল কর্মী ওয়াসিম আকরাম, শিবিরকর্মী ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও ফার্নিচার ব্যবসায়ী মো. ফারুক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়।
Advertisement
এছাড়া ১৮ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছোড়া গুলিতে দোকান কর্মচারী সাইমন (১৪), আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তানভীর সিদ্দিকী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া (২২) নিহত হয়
এই দুটি ঘটনায় করা মামলায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, চট্টগ্রামের সাবেক দুই মেয়র আ জ ম নাসির ও রেজাউল করিম, তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া উপ-কমিটির সদস্য নুরুল আজিম রনি রয়েছে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারী ছাত্রদের সংঘর্ষের মধ্যে গুলিতে নিহত হন ওয়াসিম আকরাম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এবং ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ওয়াসিম আকরাম কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবা সৌদি প্রবাসী শফিউল আলম।
Advertisement
বলা হয়েছে, ১৬ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ওয়াসিম মুরাদপুরের বারকোড রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলছিল। এই আন্দোলনের সুযোগে আসামিরা যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ছিলেন তারা অস্ত্রশস্ত্রসহ ব্যাপক সহিংসতা চালায়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, আন্দোলন চলাকালে আসামিরা ওয়াসিমের ওপর হামলা করে। তারা বোমা বিস্ফোরণ, লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক, কিরিচ এবং আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে আসামিরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে, যার ফলে ওয়াসিম বুকে ও নাভিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুনানি শেষে এক ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আজ ট্রাইব্যুনালে চট্টগ্রামের বিষয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট এবং অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করার জন্য দুটি আবেদনের ছিল আমাদের।
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলন চলাকালীন যে হত্যাযজ্ঞ হয়েছে এর সিংহভাগেই সম্পৃক্ত ছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
তিনি জানান, তদন্ত সংস্থা মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবরের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।
সাবেক মন্ত্রী হাসান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাসিরসহ চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ১৫ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের আরও একজন আসামি, যিনি কারাগারে আটক আছেন, তার নাম ফিরোজ। তিনি অভ্যুত্থানের সময়ে হামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাকে অন্য মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে এই মামলায়ও গ্রেফতার দেখানোর জন্য আমাদের আবেদন ছিল। আদালত তা মঞ্জুর করেছেন।
এফএইচ/এমআইএইচএস/জেআইএম