ড. ফোরকান আলী
Advertisement
অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর বাঁধ দিতে যাচ্ছে ভারত। উদ্দেশ্য হলো একই নদীর উজানে চীনের তৈরি বাঁধকে টেক্কা দেওয়া। কিন্তু এই দুই পাল্টাপাল্টি বাঁধ তৈরির দৌড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভাটির বাংলাদেশ। একারণেই পানি বিষয়টি নতুন করে আবারো আলোচনায়। এরও আগে, পানির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে ২০৩টি সহিংস ঘটনার ৬১টি ঘটেছে গত ১০ বছরে। হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেই চলেছে। তবে এর সবই তালিকায় আসে না। যদিও বেশ কিছুর পরিণতি মারাত্মক।
মানুষ ভূখণ্ড, জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য আরও সামগ্রীর জন্য যুদ্ধ করে। এখন পর্যন্ত পানির জন্য কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়নি। তবে পানি কখনো কখনো সামরিক বিবেচনার জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসিফিক ইনস্টিটিউটের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পানিকে কেন্দ্র করে ২০৩টি সহিংস বা আক্রমণাত্মক ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ২০০৯ সালে ভারতের মুম্বাইতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারতের রাজস্থান রাজ্যের ভরতপুর জেলার কিষানরা পানির প্রাপ্যতার ন্যায্য হিস্যাকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্কের পানির সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
জল কিওলাডিও এখন গোচারণভূমি। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল জলসিক্ত এবং বুনো হাঁসের অবাধে ঘোরাফেরার আবাসস্থল। এখানে আসত সাইবেরিয়ার পাখিরা। হিবেই প্রদেশ বেইজিংকে ঘিরে রেখেছে। হিবেইর একটি খালের মাধ্যমে বেইজিংয়ে পানি সরবরাহ করা হয়। হিবেইর মানুষরা অখুশি। অথচ এই খাল হবে চীনের দক্ষিণ-উত্তর প্রকল্পের অংশ। চীন গৃহীত আরও অনেক বিশাল এবং ব্যয়বহুল প্রকল্পের জন্য হিবেইয়ের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে। হ্যান নদী অধ্যুষিত জনগণ তাদের পানি হারাতে বসেছে ডানজিয়াংকুর মতো বিশাল ব্যয়বহুল বাঁধ নির্মাণের জন্য।
Advertisement
পানিকে কেন্দ্র করে ভারতেও একই ধরনের হতাশা এবং অসন্তুষ্ঠি বিরাজমান। এগুলোর সমাধানকল্পে সৃষ্টি করা হয়েছে ৪০টি ট্রাইব্যুনাল এবং আরও কিছু প্যানেল। কিন্তু এগুলোর সাফল্য নেই বললেই চলে। নদী অনেক বিবাদের কারণ। যেমন কাবেরি নদী অনেক রাজ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে এর পানিকে ঘিরে রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং উচ্চকণ্ঠ বাদানুবাদ অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতীয় বাদানুবাদ আরিজোনার হিংসাশ্রয়ী ঘটনার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি। ১৯৩৫ সালে আরিজোনা ন্যাশনাল গার্ড পস্তুুত করেছিল এবং আধা-সামরিক বাহিনীকে কলোরাডো নদীর পানির হিস্যাকে কেন্দ্র করে ক্যালিফোর্নিয়া সীমান্তে নিয়োগ করেছিল। এখন যেখানেই পানির সম্পৃক্ততা সেখানেই আমেরিকান রাজ্যগুলোর মধ্যে পরস্পর অবিশ্বাস এবং সন্দেহ।
একই ধরনের ঘটনা এখন ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান। ভারতীয় রাজ্যগুলোও যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছে যে, তাদের প্রদেয় পানি সম্পর্কিত তথ্যাদির তাদের বিরুদ্ধে যাবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তথ্যাদি প্রদান করে না। ইয়েমেনে কুয়া এবং ঝরনার পানিকে কেন্দ্র করে অহরহ হিংসাশ্রয়ী ঘটনা ঘটে। দারফুরে দীর্ঘদিন ধরে যে গৃহযুদ্ধ চলে আসছে তার অন্যতম একটি কারণ পশ্চিম সুদানে পানির দুষ্প্রাপ্যতা। সুদানের গৃহযুদ্ধ পানি যুদ্ধের প্রায় কাছাকাছি। তবে ভবিষ্যতে প্রকৃত পানির জন্য যুদ্ধ ঘটার অনেক লক্ষণ সারা পৃথিবীতে বিদ্যমান।
এখন পানিকে কেন্দ্র করে শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাংঘাতিক রেষারেষি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর যে কোনো একটি কেন্দ্রে যুদ্ধের দামামা বাজতে পারে। যার পরিণতিতে বিশ্বযুদ্ধও অসম্ভব নয়। বিশ্ব এর স্বাদ পেয়েছে ১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দিনের যুদ্ধে। এই যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল জর্ডান নদীকে ভিন্নমুখে প্রবাহিত করার প্রস্বাব।
ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পানি এখনো বিভেদ বা বিবাদ সৃষ্টিকর একটি বিষয়। ইসরায়েল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতর জর্ডানের শতকরা ৬৫ ভাগ পানি বলপূর্বক নিষ্কর্ষণ করে এবং দখলকৃত ওয়েস্ট ব্যাংককে নির্ভরশীল করেছে সামান্য ঈষৎ লোনাজল এবং পাহাড় অভ্যন্তরের জলাধারের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে। ফলে ইসরায়েলের নীতিবহির্ভূত এবং বলপূর্বক পানি নিষ্কর্ষণ করছে। প্রতি ইসরায়েলি গৃহস্থালির জন্য প্রতিদিন ২৯০ লিটার পানি পায় এবং এর বিপরীতে প্রতি ফিলিস্তিনি পায় মাত্র ৭০ লিটার। এটা ফিলিস্তিনিদের প্রতি শুধু অবিচারই নয়, মানবতার প্রতিও চরম অপমান।
Advertisement
আর্ন্তজাতিক নদীর অববাহিকাগুলো ১৪৫টি দেশের সীমানায় বিস্তৃত। কঙ্গো, নাইজার, রাইন এবং জাম্বেসি নদীর প্রত্যেকটি ৯-১১ দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। দানীউব নদী প্রবাহিত ১৯টি দেশের মধ্য দিয়ে। এই জটিলতা জটিলতর হয়েছে যখন দেখা যায় আফ্রিকার কিছু দেশ কয়েকটা নদীর ওপর নির্ভরশীল। ২২টি নদী গিনি থেকে উৎপন্ন বা উৎসারিত। প্রায় ২৮০টি ভূগর্ভস্থ জলাধার কয়েকটি দেশের সীমানায়। অনেক দেশ মনে করে, নদী ব্যবস্থাপনা জটিল হলেও সমাধানের আওতায়।
ভারত এবং পাকিস্তান ১৯৬০ সালে যে সিন্ধু পানি চুক্তি সম্পাদন করেছে তার মেয়াদ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই চুক্তির ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে আরও কয়েকটি পানি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এই চুক্তি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ৩টি যুদ্ধ ১৯৬৫, ১৯৭২ এবং ১৯৯৯ সালে সংঘটিত হওয়ার পরও টিকে আছে। এই চুক্তি বিবাদ এবং হিংসাশ্রয়ী ঘটনার পর টিকে থাকার দৃষ্টান্ত। নীলনদের সমস্যা উদ্বেগজনক হলেও আশা জাগানিয়া।
ইথিওপিয়ান উচ্চভূমি লেক তানা থেকে নীলনদের উত্থান। সাদা নীলের উৎপত্তি উগান্ডার ভিক্টোরিয়া লেক থেকে। দুই নীল সুদানে মিলিত হয়ে মিশরের মধ্যে প্রবাহিত। এই নদী অন্য কোথাও থেকে পানি পায় না। নীলতীরের দেশগুলোর সিংহভাগ বহু বছর ছিল ব্রিটিশ শাসিত। ব্রিটিশরা নদীর উজানে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড করতে দেয়নি যে কর্মকান্ড মিশরে নীলের প্রবাহ কমিয়ে দেয়। ১৯২৯ সালে ব্রিটেন নীলের শতকরা ৯৬ ভাগ পানি মিশর এবং অবশিষ্ট ৪ ভাগ পানি সুদানের জন্য বণ্টন করে।
১৯৫৯ সালে জামাল আবদুল নাসের ইথিওপিয়ার সঙ্গে এক চুক্তি করে পৃথিবী বিখ্যাত আসওয়ান বাঁধ তৈরি করেন। মিশর ৭৫ ভাগ পানির হিস্যা পায়। ইথিওপিয়া পায় ২৫ ভাগ। এই বাঁধ ইথিওপিয়ান পাহাড়ে হলে, সবদিক থেকে অধিকতর কল্যাণ হতো। জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ হতো সহজ। পরিবেশের ক্ষতিও হতো কম। বাঁধ নির্মাণের খরচও যেত কমে। বাঁধ নির্মাণের পর থেকে নীল অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলো অসন্তুষ্টিতে ভুগতে থাকে। বিশেষ করে কেনিয়া এবং ইথিওপিয়া নতুন করে সবার জন্য সুবিধাজনক নীল চুক্তির প্রস্তাব করলে তা ব্যর্থ হয়। গত ১১ বছর ধরে নীল নদ অধ্যুষিত ১১টি দেশ আপসে এবং বন্ধুত্ব পূর্ণভাবে নীল ভ্যালি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে নিয়মিত বৈঠক করে আসছে। ইথিওপিয়া ৩টি বাঁধ নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে ২টি বড় এবং একটি প্রশ্নবিদ্ধ পরিবেশ দূষণের প্রশ্নে। প্রকল্প উৎপাদিত কিছু পরিমাণ বিদ্যুৎ মিসর কিনবে, যার সরবরাহ হবে সুদানের মাধ্যমে।
পানির প্রয়োজনে পরস্পরের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী ২ দেশ বন্ধুত্বের বীজ রোপণ করেছে। বিশ্ব ব্যাংকার গ্রে ১শ’ বারেরও বেশি ইথিওপিয়া ও মিশর সফর করে ২ দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে এখন অক্সফোর্ডের অধ্যাপক। তিনি এই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, কালক্রমে ইথিওপিয়া ইউরোপে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে। অনেক দেশে বিস্তৃত আরেকটি নদী মেকং। মেকং তিব্বত মালভূমিতে জন্মে তিব্বতের বরফগলা পানিতে পরিপুষ্ট হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের ভেতর দিয়ে মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে প্রবাহিত। সম্প্রতি এই নদী ক্ষীণ বেগে প্রবাহিত হলেও বালুর অববাহিকা দৃশ্যমান। নাব্য কমে গেছে। কমেছে জেলেদের মাছ ধরার পরিমাণ। যে ৬ মিলিয়ন মানুষ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল তারা এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাছে। ৫০ বছরের মধ্যে দক্ষিণ চীনের সবচেয়ে জঘন্য অনাবৃষ্টির জন্য ভাটির দেশগুলো মেকং নদীর ওপর চীনের ৩টি বাঁধকে দায়ী করছে। দায়ী করছে স্রোতের বেগবর্ধক নদীগর্ভস্থ দূরারোহ ঢল বা উতরাইকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য। পানির ব্যাপারে চীন শুধু নিজের দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও অত্যন্ত কর্মতৎপর। চীন পাকিস্তান এবং আফ্রিকায় বাঁধ নির্মাণ করছে। আবাদি জমি খুঁজছে বিশ্বময়। জমি পাওয়ার জন্য চীন মোজাম্বিক ও ফিলিপাইনেও অত্যন্ত তৎপর।
চীনের প্রতিবেশী দেশগুলো বিশেষ করে ভারত অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। মেকং নদী অধ্যুষিত দেশগুলো মেকং রিভার কমিশনের সদস্য হলেও চীন এবং মিয়ানমার সদস্য নয়। এপ্রিল মাসে মেকং রিভার কমিশনের সভায় চীন বিদেশ মন্ত্রকের ভাইস মিনিস্টারকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি সব তথ্য-উপাত্ত দিতে বা দেখাতে কার্পণ্য না করলেও, জেলেদের ক্ষতিপূরণ দানের কথা বলেননি। আরও বাঁধ নির্মাণ করবে। তবে পানির কারণে আপাতত যুদ্ধের আশঙ্কা নেই বললেই চলে।
আশার কথা এই যে, নদী অববাহিকা সংঘগুলো যেমন নীল, মেকং সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। এ ধরনের সংঘ দানিউর, নাইজার ও কাভাঙ্গো, রেড, সাভা প্রভৃতি নদীর ক্ষেত্রে বিদ্যমান। সেনেগাল নদী সংঘে মালি, সেনেগাল, গিনি এবং মৌরিতানিয়া পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে সহমত পোষণ না করে কোথায় প্রকল্প হবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কে কতটা উপকার পাবে বা কীভাবে উপকার বণ্টন করা যায়, তা নিয়ে ঐকমত্য পোষণ করে। এই প্রথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে কাজ করছে এবং গ্রুপের প্রেসিডেন্ট দেশগুলোর পানি ছাড়াও নানা বিষয় নিয়ে মধ্যস্থতা করে মীমাংসা করছেন। থাইল্যান্ড লাওসের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের খরচ বহনে সাহায্য করেছে বিনিময়ে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য।
দক্ষিণ আফ্রিকা লেসোথোর সঙ্গে একই কাজ করছে। কাজাখস্থান কিরঘিজস্থানকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বিনিময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের আশায়। সিন্ধু অববাহিকার পানিকে কেন্দ্র করে যে চুক্তি তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এই কারণে যে, সেখানে উপকারের ভাগাভাগির চিন্তা না করে পানি ভাগাভাগির বিষয়ে ভাবা হয়।
আরও পড়ুন মুক্তা চাষে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ঋতুর সঙ্গে শরীরের রং বদলায় যে শিয়াললেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
কেএসকে/জিকেএস