জাগো জবস

অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমে সফলতা আসে: আবু জাফর

মো. আবু জাফর হোসাইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক (২৩ ব্যাচ) পদে চাকরি পেয়েছেন। তিনি চকময়রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে স্নাতক পাস করেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার গল্প ও নতুনদের পরার্মশ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম-

Advertisement

জাগো নিউজ: শৈশব ও বেড়ে উঠা সম্পর্কে বলুন-

মো. আবু জাফর হোসাইন: আমার শৈশব ও বেড়ে উঠা ছিল নওগাঁর ধামইরহাটের এক প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায়। শৈশবটা অনেক সাদামাটা ছিল। তবে পরিবারের ভালোবাসার কমতি ছিল না। নানি-নানার বাড়িতে কাটিয়েছি অজস্র সময়, সেখানে রয়ে গেছে অনেক স্মৃতি। শৈশব কেটেছে গ্রামে দুরন্তপনায়, খেলে বেড়িয়েছি মাঠে, নদী-নালায়। সেই দিনগুলো ছিল খুবই আনন্দময়। সকালে উঠে বন্ধুদের সঙ্গে মুঠোফোন ছাড়াই নানান খেলা, গাছের ডালে লুকোচুরি, কিংবা নদীর পাড়ে বসে গল্প করা- সবকিছুই ছিল এক অসাধারণ সরলতায়। গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকায় ছিল এক অদ্ভুত শান্তি ও আনন্দ। শৈশবে অনেক কিছু হওয়ার ইচ্ছে হতো, তবে সবচেয়ে বড় ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার। আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না, জীবন যাত্রা ছিল খুবই সাধারণ।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির স্বপ্ন দেখলেন কখন থেকে?

Advertisement

মো. আবু জাফর হোসাইন: বাংলাদেশ ব্যাংক, যা আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক কর্তৃপক্ষ। এখানে চাকরি করার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। আমিও সেই স্বপ্নে বিভোরদের মধ্যে একজন। রুয়েটের ফাইনাল ইয়ারে পড়াশোনাকালীন যখন চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন ফেসবুকে চাকরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সেমিনারগুলোতে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকগুলোতে চাকরির সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারি। রাজশাহীতে পড়াশোনার সুবাদে, এই শহরের প্রতি আমার একটা বিশেষ ভালোবাসা ছিল। মনে হতো যদি এখানেই চাকরি শুরু করতে পারতাম, তবে এটি আমার জন্য একটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতো। যেখানে আমার শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে, সেখানে যদি চাকরিজীবন শুরু করা সম্ভব হতো, তবে সেটা হতো অনেক বড় একটি অর্জন। বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করার সুযোগ-সুবিধা, সেন্ট্রাল ব্যাংকার হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজশাহীতে বসবাসের বাসনা- এই তিনটি আকাঙ্ক্ষা একত্রিত হয়ে রুয়েটে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে থাকতেই আমার মনে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করার স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলাম।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার গল্প শুনতে চাই?

মো. আবু জাফর হোসাইন: আমার অনার্স শেষ হওয়ার পরপরই পৃথিবীজুড়ে করোনা মহামারি শুরু হয়। তখন পুরো পৃথিবী এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে ভাবতাম, একদিন সব কিছুর অবসান হবে এবং নতুন একটি সূচনা হবে। করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে যখন সমন্বিত ব্যাংকের পরীক্ষা শুরু হলো, তখন আমি অংশগ্রহণ করতে শুরু করলাম। প্রথম দিকে অনেকটা অনিশ্চিত এবং ভয় ছিল। কিন্তু যখন প্রিলিমিনারি এবং রিটেন পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করি, তখন আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রিলিমিনারি, রিটেন এবং ভাইভা পরীক্ষাতেও সফল হব। অবশেষে আমি সত্যিই ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হই এবং চূড়ান্ত ফলাফলে আমার নাম দেখতে পাই। এটি ছিল আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সততা এবং ধৈর্যের ফল। এই যাত্রা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে- কিভাবে অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমে সফলতা আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাওয়া জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন, যা আমাকে নতুন দৃষ্টিকোণ এবং আরো বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণের প্রেরণা দিয়েছে।

জাগো নিউজ: আপনার সাফল্যের পিছনে কাদের অনুপ্রেরণা ছিল?

Advertisement

মো. আবু জাফর হোসাইন: আমার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং একটি ভালো চাকরি পাওয়ার ইচ্ছা। আমার গ্রামে শিক্ষার হার কম এবং সরকারি চাকরি বা ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মানুষের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে আমি নিজের মধ্যে একটি গোপন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করি- ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার। এই আকাঙ্ক্ষাই ছিল আমার এগিয়ে চলার মূল অনুপ্রেরণা, যা আমাকে কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতা দিয়ে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করেছে।

জাগো নিউজ: কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?

মো. আবু জাফর হোসাইন: আমি যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছিলাম, তখন বিয়ে করি। সে সময়টা টিউশনি করে ভালোই চলছিলাম। কিন্তু স্নাতক পাস করার পরেই শুরু হয় করোনার প্রকোপ। করোনা পরিস্থিতির কারণে রাজশাহী ছেড়ে বাড়ি চলে আসি এবং এক বছর বাড়িতেই থাকি। এই সময়টা মূলত চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ করি। স্নাতক শেষ করে বাড়িতে বসে থাকায় আমার পরিবার, প্রতিবেশী, এমনকি শ্বশুরবাড়ির লোকজনও নানা কটু কথা শুনাতে শুরু করে। যা প্রতিদিন আমাকে অত্যন্ত কষ্ট দিত। এই কথাগুলো শুনে আমি প্রায়ই কাঁদতাম কিন্তু মনঃকষ্ট সত্ত্বেও আমাকে লক্ষ্য পূরণের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমলে বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে গাজীপুর চলে যাই। সেখানে একটি স্কুলে পার্ট টাইম ক্লাস নিতাম এবং চাকরির প্রস্তুতি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতাম। গাজীপুরে থাকার সময়েই আমি রুপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার সুখবরটি পাই। যা আমার জন্য একটি নতুন আশা এবং উদ্দীপনা নিয়ে আসে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পেতে নতুনরা কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন?

মো. আবু জাফর হোসাইন: চাকরির জন্য প্রস্তুতি একটি দীর্ঘ, কঠিন এবং পরিশ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া। এতে দৃঢ় মনোবল ও অধ্যবসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুনদের জন্য পরামর্শ হলো- ব্যাংক প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যে কোনো একটি সিরিজের বই ভালোভাবে শেষ করা উচিত। নিয়মিত অধ্যয়ন করা খুব জরুরি। একদিনও পড়াশোনার বাইরে থাকা যাবে না। দিনের সর্বোচ্চ সময়টা কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন এবং একটানা এক বছর পড়াশোনা করলে প্রস্তুতির বেশিরভাগ বিষয়ই কভার হয়ে যাবে। এরপর বারবার রিভিশন করতে হবে। কারণ প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য রিভিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংক রিটেন পরীক্ষার জন্য মূলত ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। যে যত বেশি ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ে দক্ষ হবে, সে তত ভালোভাবে ব্যাংক রিটেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে। ব্যাংক রিটেনের প্রধান বিষয় হলো- অনুবাদ, গণিত, জেনারেল নলেজ (জিকে) এবং ফোকাস রাইটিং। অনুবাদে ভালো করতে হলে ইংরেজি শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত অনুবাদ প্র্যাকটিস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের কিছু অংশ পড়া উপকারি হতে পারে। তিন-চার মাস এইভাবে অভ্যাস করলে অনুবাদে অনেক উন্নতি হবে। অনুবাদে দক্ষ হলে রিটেনের অন্যান্য অংশ যেমন প্যাসেজ সলুশন এবং ফোকাস রাইটিংয়ে ভালো করা যাবে।

গণিতে ভালো করার জন্য একটি ভালো ব্যাংক রিটেন ম্যাথ বই সংগ্রহ করে নিয়মিত প্র্যাকটিস করুন। যেগুলো কঠিন মনে হবে, সেগুলো মার্ক করে রাখুন এবং পরীক্ষার আগেরদিন রিভাইজ করুন। জিকের জন্য বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং ফেসবুক পেজ থেকে জেনারেল নলেজ সংগ্রহ করে খাতায় নোট করুন। পাশাপাশি ব্যাংকিং সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ টার্মস এবং বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করুন। ফোকাস রাইটিংয়ের জন্য প্রতিদিন সংবাদপত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় সংগ্রহ করুন এবং তা ইংরেজি ও বাংলায় একসাথে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বাংলা ফোকাস রাইটিংগুলো নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করে খাতায় নোট করুন। এভাবে নিয়মিত এবং ধারাবাহিক প্রস্তুতি নিলে নতুনরা সহজেই ব্যাংক পরীক্ষায় সফল হতে পারবেন।

জাগো নিউজ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

মো. আবু জাফর হোসাইন: ভবিষ্যতে আমার জন্মস্থানের সাধারণ মানুষের জন্য কিছু ভালো কাজ করতে চাই। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নত করতে চাই। নিজের এলাকার শিক্ষার হার বৃদ্ধির জন্য কিছু যুগান্তরকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাই। অবসরের পর এলাকাবাসীর উন্নয়ন সাধনের জন্য কাজ করে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ। আমার কাজের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা থাকবে।

এমআইএইচ/এএসএম