এক সময় ঢাকা ছিল নানা উৎসবের রঙে রঙিন বর্ণিল নগরী। নানা উদযাপন নিয়ে হাজির হতো ঈদ। ঈদ মিছিল ছিল এর অন্যতম অনুষঙ্গ। ঈদ মিছিল পুরো নগরকে বেঁধে দিত এক আত্মীয়তার বন্ধনে। কালে কালে ঈদ মিছিলের চিত্র পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়।
Advertisement
ইতিহাসে সুলতানি আমলে ঈদ মিছিলের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না গেলেও তখন যে ধর্মীয় আচার-উৎসব বিকাশ লাভ করেছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ঈদ মিছিলের প্রচলন মূলত মোগল আমল থেকে, ১৬১০ সালে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতী যখন বাংলা সুবার রাজধানী বিহারের রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। নায়েব-নাজিমদের আমলে ঈদ মিছিল বিস্তৃতি লাভ করে ও বর্ণাঢ্য হয়। ব্রিটিশ আমলেও সগৌরবে বহাল ছিল ঈদ মিছিলের ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলে এটি অব্যাহত থাকলেও একপর্যায়ে বন্ধও হয়ে যায়।
এরপর গত শতাব্দীর শেষ দশকের শুরুতে চালু হয় ঢাকার ঈদ মিছিল। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবেদন ধরে রাখতে না পেরে এখন প্রায় হারিয়ে গেছে পুরান ঢাকার ঈদ মিছিলের ঐতিহ্য।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে হারানো ঈদ মিছিলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘দিন যত যাচ্ছে ঈদ আয়োজনটি ক্রমে কালেক্টিভ, সামাজিক রূপ থেকে ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক উৎসবে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমরা ঈদের দিন অনেকটাই টিভি দেখে, ঘুমিয়ে কাটাচ্ছি।’
Advertisement
আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘সুলতানি আমল কিংবা মোগল আমলে ঈদের ঐতিহ্য নামাজের পর ঈদ মিছিল, আমরা সেই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করতে চাই। এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্যমেলা মাঠে ঈদের জামাতের পর একটি বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিলের আয়োজন করব।’
এ মিছিলে নগরবাসীকে শামিল হয়ে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এ উপদেষ্টা।
২৬ মার্চ তিনি তার ফেসবুকে একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন, পুরোদমে চলছে ঈদ মিছিলের প্রস্তুতি। সময় স্বল্পতা স্বত্ত্বেও দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। মিছিলে আসছে ঐরাবতও, আপনি আসছেন তো?
ঢাকার মোগল শাসনকর্তা ইসলাম খাঁর আমল থেকেই ঢাকায় ঈদ উৎসবের পরিচয় পাওয়া যায়। খুব ধুমধাম করে ঈদ উৎসব পালিত হতো তখন। ইসলাম খাঁ নবনির্মিত লালবাগ মসজিদে গিয়ে নামাজে যোগ দিতেন। ঈদের মিছিল বের হতো। কেল্লা থেকে ঘোড়সওয়ার হয়ে বেরিয়ে আসতো ফৌজি বহর, এসে যোগ দিত মিছিলে। হাতিশালা থেকে হাতির দল নিয়ে এসে নানারকম সাজে সেজে মাহুতরা যোগ দিতেন মিছিলে।
Advertisement
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল সুবেদাররা ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকে ঈদ আনন্দ উৎসব উৎকর্ষ লাভ করে। সুবেদার ইসলাম খাঁ যে সময় ঢাকায় আগমন করেন তখন রমজান মাস ছিল। প্রথম বছরই ঈদের আনন্দ জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। একদিকে রাজধানী স্থাপনের আনন্দ, অপরদিকে ঈদের আনন্দ। ইতিহাসবিদদের ধারণা, মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতী ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকেই ঈদের মিছিল বা আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল।
আরও পড়ুন
ঢাকায় হবে ঈদ মিছিল, বসবে মেলা: আসিফ মাহমুদ ঈদ আনন্দ উৎসব আয়োজন করছে ডিএনসিসি পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী ঈদ আনন্দ মিছিল-শোভাযাত্রাএ সম্পর্কে ‘যুগে যুগে ঢাকার ঈদমিছিল’ বইয়ে রফিকুল ইসলাম রফিক লেখক আশরাফ-উজ-জামানকে উদ্বৃত করে লিখেছেন, ঢাকার মোগল শাসনকর্তা ইসলাম খাঁর আমল থেকেই ঢাকায় ঈদ উৎসবের পরিচয় পাওয়া যায়। খুব ধুমধাম করে ঈদ উৎসব পালিত হতো তখন। ইসলাম খাঁ নবনির্মিত লালবাগ মসজিদে গিয়ে নামাজে যোগ দিতেন। ঈদের মিছিল বের হতো। কেল্লা থেকে ঘোড়সওয়ার হয়ে বেরিয়ে আসতো ফৌজি বহর, এসে যোগ দিত মিছিলে। হাতিশালা থেকে হাতির দল নিয়ে এসে নানারকম সাজে সেজে মাহুতরা যোগ দিতেন মিছিলে।
রফিকুল ইসলাম রফিক আরও জানিয়েছেন, নিমতলী প্রাসাদে বসবাসকালীন নায়েব নাজিমদের সময়ও অনুষ্ঠিত হয় ঈদের মিছিল। তাদের দরবারে সেই সময় আঁকা ঈদ ও মহররম মিছিলের ৩৯টা ছবি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা। এর মধ্যে ২২টি ঈদের মিছিলের ছবি। ছবি দেখে বোঝা যায় নবাবি আমলের ঈদ মিছিলের বর্ণাঢ্যরূপ ও তার ব্যাপকতা। নিমতলী প্রাসাদ থেকে এ মিছিল শুরু হয়ে তখনকার বড় বড় রাজপথ অতিক্রম করত। চিত্রগুলো দেখে আমরা জানতে পারি নায়েব নাজিমের ঈদ ও মহররম মিছিলে নবাব কাটারা, দেওয়ান বাজার, হোসেনি দালান, বকশীবাজার, বেগমবাজার, বেচারাম দেউরী, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, চকবাজার, গিরদে উর্দু রোড এসব মহল্লা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মিছিলের সামনের সারিতে নায়েব নাজিম নুসরাত জং হাতির পিঠে বসতেন। বরদার (বাহক) কৃত্রিম মুক্তা ও রৌপ্য তারের অলংকারযুক্ত শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক ছাতা তার ওপরে তুলে ধরতেন। নানা রকম জরি আর লাল মখমল কাপড় দিয়ে হাতি সাজানো হতো। আরও থাকত ঘোড়া, উট, পালকি, ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ সিল্কের শত শত নিশান মিছিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিত। নবাবদের সুসজ্জিত বাদ্যযন্ত্রের দল নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নিয়ে চলত।
বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে থাকত ঢোল, বাঁশি, কাড়া-নাকাড়া, শিঙা। ঈদ মিছিলে হাতির পিঠে হাওদায় বসে অভিবাদন জানাতেন নায়েব নাজিম নুসরাত জং বাহাদুর। তার পেছনের হাতিতে থাকতেন নবাবের ছোট ভাই শামসুদ্দৌল্লা। ঈদের মিছিলে নায়েব নাজিমরা নেতৃত্ব দিতেন। নবাবদের সঙ্গে হাতির পিঠে সওয়ার হতেন ঢাকার জমিদার ও সম্মানীত ব্যক্তিরা। নবাবদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন। এ মিছিলে তৎকালীন বিদেশিরাও অংশগ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে রাস্তায় দেখা যেত নানা রকম খেলা দেখানেওয়ালা।
আরও পড়ুন
বাণিজ্যমেলার মাঠে ঈদ আয়োজনে মোগল ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হবে উপমহাদেশে ঈদুল ফিতরের অতীত বদলে গেছে গ্রামের ঈদ আনন্দঢাকার নবাবরা তাদের শৌখিনতা প্রভাব প্রতিপত্তি ও ঈদের আনন্দ অতি জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করার জন্য মিছিলের ব্যবস্থা করতেন। আনন্দের রঙে রঙিন আর ঝলমল হয়ে উঠত ঈদের রাজকীয় মিছিল। হাতির পিঠে জমকালো হাওদায় সওয়ার হতেন নবাবি দরবারের রাজপুরুষরা। মিছিলে শুধু রাজ দরবারের লোকজন অংশ নিতেন। সাধারণ মানুষ সেখানে দর্শক। রাস্তায় দুই ধারের এবং দালানের ছাদে দাঁড়িয়ে লোকজন তাকিয়ে দেখত এ দৃশ্য। মৃদু হাসিতে মানুষকে সম্ভাষণ জানাতেন নবাব।
চমৎকার পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানরা প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করতেন। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথে পথে টাকা-পয়সা ও উপহারদ্রব্য ছড়িয়ে দিতেন এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানরা গরিবদের ভিক্ষা দিতেন।
আশরাফি বিতরণরফিকুল ইসলাম রফিক আরও লিখেছেন, নবাবের হাতির পেছনে অশ্বারোহীর দল চলত রাজকীয় ব্যান্ডের তালে। সুসজ্জিত আরবীয় ঘোড়াগুলো যেন পা থামিয়ে রাখতে চাইতো না। ঢাকার পথ পরিক্রম করার জন্য উৎসাহী তারা কেশর হেলিয়ে দুলিয়ে টগবগ করে চলত। মিছিলের শান-শওকত দেখে লোক মুগ্ধ হতো। রাস্তার পাশে বিভিন্ন দালানকোঠার ছাদে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখত নর-নারী। আতর, গোলাপ আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রসন্নতা ছড়িয়ে পড়ত বাতাসে। মিছিল দেখতে আগত লোকজন ছড়িয়ে দিত মুঠো মুঠো গোলাপের পাপড়ি। হাতির পিঠে উপবিষ্ট নবাবের চারপাশে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ত এগুলো। রাস্তার পাশে ভিক্ষুক হাত উঁচিয়ে ভিক্ষা চাইত। রাজপুরুষরা পথে আশরাফি বিতরণ করতেন।
ড. এম এ রহিমের ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস (মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও ফজলে রাব্বি অনূদিত)’ বইয়ে রয়েছে, চমৎকার পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে মুসলমানরা প্রভাতে ঈদগাহ ময়দান বা ঈদের নামাজের স্থানে শোভাযাত্রা করে গমন করতেন। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথে পথে টাকা-পয়সা ও উপহারদ্রব্য ছড়িয়ে দিতেন এবং সাধারণ অবস্থার মুসলমানরা গরিবদের ভিক্ষা দিতেন।
এম এ রহিম আরও লিখেছেন, নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খান গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেন বিলগ্রামী লিখেছেন যে, নবাব সুজাউদ্দীনের অধীনস্ত ঢাকার নায়েব সুবেদার মুর্শিদকুলী খান ঈদের দিন ঢাকার দুর্গ থেকে ঈদের ময়দান পর্যন্ত একক্রোশ পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে যেতেন।
ইতিহাসবিদ ও লেখক রানা সাফভির ‘হাও দ্য বাদশাহস অব দিল্লি সেলিব্রেটেড ঈদ ডিউরিং দ্য ফাইনাল ইয়ারস অব দ্য মোগল এম্পায়ার’ প্রবন্ধে ঈদ মিছিলের কথা রয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে বাহাদুর শাহ জাফর হাতির পিঠে ওঠার জন্য কেদারায় বসার পর তার পাশে বসলেন বাদশাহর ছেলেরা। ঈদগাহ অভিমুখে ঈদের প্রথম জামাত আদায়ের সে যাত্রাই হতো ঈদ মিছিল। মোগল আমলের এই ঐতিহ্য ঢাকা শহরেও এসেছে মোগল আমলেই।
‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ বইয়ে যা লেখা আছে‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ বইয়ে নাজির হোসেন লিখেছেন, জেলখানা রোডের বাইশ পঞ্চায়েতের বিশিষ্ট সদস্য, নামকরা ব্যবসায়ী মহল্লা সরদার মরহুম আহসান মুহাম্মদ নবী বা জুম্মন বেপারীর এবং মমিন মোটর কোম্পানির মালিক দানবীর আবদুল আজিজের উদ্যোগে এবং প্রচেষ্টায় ঢাকায় তৎকালে ঈদের পরদিবস এক বর্ণাঢ্য মিছিলের আয়োজন হতো। ওই মিছিলে ব্রিটিশ আমলের শেষ অধ্যায় থেকে চালু ছিল। প্রথমে সাদাসিদা কাসিদা পার্টির দলসমূহ আর মমিন মোটর কোম্পানির মোটরযানগুলো জাহাজ, প্লেন, ময়ূর এবং নৌকার মতো সাজিয়ে মিছিলে বের করা হতো।
নাজির হোসেন আরও লিখেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে ওই মিছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে পড়ে। তবে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যাগুলো ফুটিয়ে তোলাই ছিল ওই মিছিলের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু দিনের গতিধারায় ওই মিছিল ব্যক্তি সমালোচনাকর বিষয়ে পরিণত হয়। তাছাড়া মিছিলে দলাদলি মারামারি দেখা দেওয়ায় শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ ওই মিছিল বন্ধ করে দেন।
আরও পড়ুন
সালামি আদান-প্রদানে বাড়ে ঈদ আনন্দ ঈদে সুস্থ থাকতে কী করবেন, কী করবেন না ঈদুল ফিতরের আনন্দ ও আমাদের করণীয়‘ওই মিছিল যারা উপভোগ করেন তাদের স্মৃতিপটে আজও সব কিছু জ্বলজ্বল করছে। মিছিলে হাস্য-কৌতুক আমোদ-প্রমোদের যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকতো। ঈদ উৎসব পালনের পর গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে লোকসমাগম হতো ঢাকা শহরে। আজাদ মুসলিম ক্লাবের পক্ষ থেকে আমরাও মুসলিম গোত্রের বিভিন্ন সমস্যার চিত্র তুলে ধরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পোশাক পরিচ্ছদ পরে ওই মিছিলে অংশগ্রহণ করতাম। আমাদের ওই মিছিলে যেরূপ জৌলুসের ব্যবস্থা থাকতো, তেমনি থাকতো অর্থবহ দিকের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। মিছিলটি জুম্মন বেপারীর বাড়ির নিকট হতে আরম্ভ হয়ে চক-মোগলটুলি, ইসলামপুর সদরঘাট হয়ে কাচারী, নবাবপুর বংশাল হয়ে পুনঃচকবাজারে এসে শেষ হতো’ লিখেছেন নাজির হোসেন।
ঈদ মিছিলে হামলাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক মুহাম্মদ সিদ্দীক খান ঈদ মিছিল সম্পর্কে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান কোয়ার্টারলিতে ‘লাইফ ইন ওল্ড ঢাকা’ শিরোনামের লেখায় জানিয়েছেন- ঢাকার ঈদ মিছিল পুনরায় পূর্ব গৌরব নিয়ে পুরুজ্জীবিত হয়েছে। যেহেতু পাকিস্তানের অর্জন একটি মহান দিবস হিসেবে পরিগণিত। এই মিছিল ১৯২০ সালের দুর্যোগ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে চালু ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হাঙ্গামায়, উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য পরিত্যক্ত হয়ে গেল।
ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আগে ১৯৪৬ সালে আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন নবাবপুরে ঈদ মিছিলে হামলা হয়। এ বিষয়ে ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’য় লেখা হয়েছে, ভারত বিভাগের পূর্বে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনকার একটি ঈদের মিছিল নবাবপুর রোডের ভেতরে প্রবেশ করে তখন নবাবপুরের রাস্তায় দুই দিকের হিন্দু ভবনগুলো থেকে ইট বৃষ্টি, পাটা-পুতা, চৌকি, বাড়ির ভারী আসবাবপত্র মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের ওপর বর্ষিত হওয়ার ফলে বহু মুসলমান যুব-বৃদ্ধা আহত হয়েছিলেন। সে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। নবাবপুরে তখন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের একক বাসস্থান ছিল। এ ঘটনার পরও অনেক বছর ঈদের মিছিল বের হয়েছিল।
পাকিস্তান সরকার দেশে সেকশন ৯২-এ জারি করায় গৌরবময় ঈদ মিছিল ১৯৫৩-৫৪ সালের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে ঢাকার ঈদের মিছিল কিছুটা দুর্বল আকার ধারণ করলেও ঢাকাইয়ারা সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দেয়নি। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ঈদ মিছিল ১৯৯১ সালে হাজারীবাগের ‘ঢাকাবাসী’ সংগঠন ফের শুরু করে। ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার নাজির হোসেন নাজির ঢাকায় আনন্দ মিছিল পরিষদ গঠন করে আবারো ঈদ মিছিল প্রচলন করেন। ওই সময় একটি নীতিমালাও করা হয়। মেয়র মোহাম্মদ হানিফের আমলে তা কিছুটা প্রাণও পায়।
ঈদ মিছিলে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠন ও মহল্লাবাসীকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার দেওয়া হয় পরবর্তী কয়েক বছর।
মিছিলে হাতি ও ঘোড়া আনা হতো। হাতি ঢাকার বর্মী জমিদার বাড়ি ও নেত্রকোনা জমিদার বাড়ি থেকে আনা হতো। মিছিলে গান গাওয়া হতো। গানগুলো বেশিরভাগই উর্দু ভাষায় গাওয়া হতো। রোজার মাসে যারা কাসিদা গেয়ে রোজাদার জাগাতেন সেই কাসিদা গায়কদের ঈদ মিছিলের দিন পুরস্কৃত করা হতো। ব্যায়াম বীর ও কুস্তিগিররা ঈদের মিছিলে তাদের নিজ নিজ নৈপুণ্য দেখাতেন।
‘গরুর গাড়িতে ভ্রাম্যমাণ গ্যালারি হতো। কোনোটায় দেখা যেতো একজন পিঠে থাবড়া দিয়ে চটাস চটাস আওয়াজ তুলছে। মানে হলো মশা খুব বেশি ঢাকা শহরে, সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নাও। আরেকবার দেখে ছিলাম, একজনকে জুতা পেটা করা হচ্ছে। মানে শহরে চোর বেড়েছে। মিছিলটা দেখার জন্য ঢাকার বাইরে থেকেও প্রচুর লোক জড়ো হতো।’ ঢাকার অন্যতম পঞ্চায়েত সর্দার মওলা বখশের ছেলে আজিম বখশ
ঈদ মিছিলে সমস্যার চিত্র উপস্থাপনতৎকালীন ঈদ মিছিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক এবং মুসলিম দেশগুলোর ঘটনা ক্যারিকেচারের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। ঈদের মিছিলে ঢাকার প্রায় সব মহল্লা থেকে মুসলিম বিশ্বের এবং নগর জীবনের ঐতিহ্য ও সমস্যার চিত্রগুলো তুলে ধরে তাদের দুঃখ সহানুভূতি প্রকাশ করা হতো।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বখশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদ মিছিল ছিল ঢাকায় ঈদের পরের বড় আয়োজন। এর বয়স তিনশ হয়ে যাবে। ঢাকার নায়েবে নাজিমরা এর প্রচলন ঘটিয়েছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘সব পাড়া-মহল্লা থেকে ঈদ মিছিল বের হয়ে জড়ো হতো চকবাজারে। সেখান থেকে ইসলামপুর, নবাবপুর, নারিন্দা, গেন্ডারিয়া ঘুরত এ মিছিল। তবে এ মিছিল কেবল আনন্দযাত্রা ছিল না, অভাব-অভিযোগের প্রকাশও ঘটত এতে।’
‘গরুর গাড়িতে ভ্রাম্যমাণ গ্যালারি হতো। কোনোটায় দেখা যেতো একজন পিঠে থাবড়া দিয়ে চটাস চটাস আওয়াজ তুলছে। মানে হলো মশা খুব বেশি ঢাকা শহরে, সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নাও। আরেকবার দেখে ছিলাম, একজনকে জুতা পেটা করা হচ্ছে। মানে শহরে চোর বেড়েছে। মিছিলটা দেখার জন্য ঢাকার বাইরে থেকেও প্রচুর লোক জড়ো হতো। বাড়ির বারান্দায়, ছাদে লোক উপচে পড়ত’ বলেন ঢাকার অন্যতম পঞ্চায়েত সর্দার মওলা বখশের ছেলে আজিম বখশ।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও ঢাকা শহরে শোভাযাত্রা বা মিছিল করে ঈদগাহের মাঠে যাওয়ার প্রচলন ছিল। এ সম্পর্কে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের স্মৃতিচারণ ‘যুগে যুগে ঢাকায় ঈদের মিছিল’ বইয়ে তুলে ধরেছেন রফিকুল ইসলাম রফিক। সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ‘আমার ছেলে বেলায় ঈদের উৎসব দেখেছি সম্মিলিত আনন্দের উৎসব হিসেবে। ঢাকার পুরানা পল্টনে ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত হতো। বিভিন্ন মহল্লা থেকে লোকেরা মিছিল (শোভাযাত্রা) করে আসত নামাজে অংশগ্রহণের জন্য। এভাবে মিছিল করা নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। সবারই চেষ্টা ছিল আপন আপন মিছিল অন্যান্য মিছিলের চাইতে বর্ণাঢ্য করা। এই বর্ণাঢ্য করার স্বরূপটা ধরা পড়তো মাথার টুপিতে এবং নিশান ওড়ানোর মধ্য দিয়ে। একবারের কথা মনে আছে। সেবার সবচেয়ে সুন্দর মিছিল এসেছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে।’
মিছিল প্রসঙ্গে সৈয়দ আলী আহসান আরও জানান, ঈদের দিন সকালে এসব মিছিল দেখার জন্য রাস্তার ধারে হিন্দু-খ্রিষ্টানরা দাঁড়িয়ে থাকতো। ঢাকায় বিদেশি যারা ছিল তারাও এসব মিছিলের ফটো তোলার জন্য এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতেন।
আরএমএম/এমএমএআর/এমএস