পাবনার কাজিরহাট-আরিচা নৌপথের কাজিরহাট ঘাটে স্পিডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া ও যাত্রী বহনের অভিযোগ উঠেছে। এতে ভোগান্তি বেড়েছে যাত্রীদের।
Advertisement
যাত্রীদের অভিযোগ, সাধারণ ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ১২ জন বহনের কথা থাকলেও বোটে নেওয়া হচ্ছে ১৬ থেকে ২০ জন করে যাত্রী, নেই পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থাও। এতে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন যাত্রীরা।
যাত্রীরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে এই রুটে দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ ছিল স্পিডবোট সেবা। কিন্তু চালুর পরও স্বস্তির পরিবর্তে সেই ভোগান্তিই পোহাতে হচ্ছে তাদের। সাধারণ ভাড়ার তুলনায় নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি। এক বোটে গাদাগাদি করে ২০ জন করেও যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। দেয় হচ্ছে না লাইফ জ্যাকেট। এতে ঝুঁকি ও ভোগান্তির শেষ নেই তাদের।
আমিনপুর থানার সাগরকান্দি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন রেজাউল করিম শেখ। অর্থ ও সময় অপচয় রোধ এবং স্বস্তির যাত্রার জন্য নৌপথে পাড়ি জমিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো জায়গায় নিয়ম কানুনের বালাই নেই। দেখুন যে বোটটিতে উঠতে যাচ্ছি তাতে ১৬ জন যাত্রী ওঠানো হয়েছে। ওই পাশের আরেকটি বোটে প্রায় ২০ জন নেওয়া হয়েছে। এদিকে শুনলাম সম্প্রতি নাকি প্রশাসন ও অন্যান্যরা মিটিং করে ভাড়া ২২০ টাকার মধ্যে রাখতে বলেছে। একইসঙ্গে ১২ জনের বেশি যাত্রী তুলতে নিষেধ করেছে ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রত্যেক যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কিছুই নেই।
Advertisement
আরও পড়ুন-
স্বপ্নের ফেরিতে দুঃখ ঘুচলো সন্দ্বীপবাসীর ঈদের আগে-পরে ১০ দিন বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে নেই সেই দস্যুতা, তবুও কাটে না দুর্দশাতিনি বলেন, কাউন্টারে গেলাম, ২৫০ টাকা ভাড়া ও ১০ টাকা ঘাট চার্জ বাবদ ২৬০ টাকা রেখে দিল। কোনো টিকিট দেয়নি। ভাড়া এত কেন জিজ্ঞেস করলে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পূর্বে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতারা ঘাট দখলে নিয়ে এসব অপকর্ম করেছে। কিন্তু এখনো সেই একই অবস্থা। তাহলে এতোগুলা ছাত্রজনতার জীবন দেওয়ার কী অর্থ? অর্থ ও সময় অপচয়ের পাশাপাশি স্বস্তির যাত্রার জন্য দ্রুতগতির এ স্পিডবোটে যাওয়া। কিন্তু এখানে স্বস্তি নেই। আছে শুধুই ভোগান্তি ও ঝুঁকি।
ঢাকা থেকে সড়কপথে যমুনা সেতু হয়ে পাবনায় আসতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বেশি সময় লাগে। এজন্য নৌপথে স্পিডবোট বেছে নিয়ে পাবনায় ফিরছিলেন রাইসুল আলম। দীর্ঘদিন বন্ধের পর আবার চালু হলেও স্পিডবোটেও সেই ভোগান্তি জানিয়ে তিনি বলেন, ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে ১০ টাকা ঘাটে প্রবেশের জন্য। লাইফ জ্যাকেট বা এরকম কিছুই নেই। ২০ থেকে ২৫ মিনিট দূরত্বের নৌপথে এই ভাড়া অনেক বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এদিকে নজর দিয়ে একটা ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত।
Advertisement
যাত্রী সোয়েব মালিথা, আফসার ও নাজমা জানান, কোনো নিয়ম মানা হয় না ঘাটে। টিকিট ছাড়া টাকা নিয়ে স্পিডবোটে পারাপার করা হচ্ছে। কারো থেকে ২৬০, কারো থেকে ২৮০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে। কখনো কখনো সাদা কাগজে ২৫০ টাকার সিল মেরেও টাকা নেওয়া হচ্ছে। কারো থেকে ৩০০ টাকাও নিচ্ছে। কিন্তু এদের কিছু বলা যায় না। কিছু বলতে গেলে আশপাশে থাকা অন্যরা এসে জেঁকে ধরে, অসম্ভব খারাপ আচরণ করে। আবার বৃষ্টির মধ্যেও অবাধে বোট চলছে। কোনো কোনো বোটে ১৬ থেকে ২০ জন যাত্রী নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এগুলো দেখেও দেখে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
বিআইডব্লিউটিএ, স্থানীয় ও বোট সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৮ সালে সবশেষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ১৫০ টাকা করে স্পিডবোটের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এরপর আর সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। বোট পরিচালনা ব্যয় ও যাত্রী স্বার্থ বিবেচনায় বিআইডব্লিউটিএ ও বোট মালিকরা মৌখিকভাবে নির্ধারণ করে ভাড়া আদায় করছেন। ২০০ টাকার মধ্যে ভাড়া রাখার দাবি থাকলেও আওয়ামীপন্থি বোট মালিকরা সুযোগ বুঝে কখনো কখনো ২৫০ টাকা ভাড়াও নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় সেটি বন্ধও করা হয়েছে।
৫ আগস্টের পর ওইসব বোট মালিকরা আত্মগোপনে গেলে দীর্ঘ চার মাস বন্ধের পর গত ১৪ ডিসেম্বর আবার প্রথম পর্যায়ে ৫৪টি বোটের রুট পারমিট দিয়ে স্পিডবোট সেবা চালু করা হয়। এখন আরিচা ও কাজিরহাট দুই পাড়ে মোট ১১৯টি বোট চলাচল করছে। আরও ১৬টি বোটের রুট পারমিট অপেক্ষমাণ রয়েছে। তবে এখনও এ রুটে ভাড়া নির্ধারণ হয়নি। ফলে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে খেয়াল খুশিমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বোট সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে এই রুটে ঈদযাত্রা স্বস্তির করতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এতেও থামেনি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ঘাটে ফেরেনি শৃঙ্খলা।
তবে বোট মালিকরা বলছেন, প্রতি ট্রিপে একটি বোটের পেছনে ব্যয় রয়েছে কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ২৫০ টাকার নিচে ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। লোকসান হলে বোট চালানো বন্ধ করাসহ ঘাট অচলের ইঙ্গিতও তাদের।
এ ব্যাপারে বোট মালিক সমিতির সভাপতি রইস উদ্দিন বলেন, এখনো প্রজ্ঞাপন না হলেও রোববার (২৩ মার্চ) বিআইডব্লিউটিএ অফিস থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া নিতে বলা হয়েছে। এর বাইরে কারও অতিরিক্ত নেওয়ার কথা নয়। আর এই ভাড়া বেশি নয়, উল্টো এতে বোট মালিকদের পোষায় না। কারণ প্রতি ট্রিপে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ। এর কম হলে বোট মালিকরা লোকসানে পড়বে।
যাত্রী নেওয়া ও লাইফ জ্যাকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১২ জন যাত্রী নেওয়ার কথা থাকলেও বেশকিছু বিষয় বিবেচনায় সর্বোচ্চ ১৪ জন নেয় কোনো কোনো বোট। এর বেশি নেওয়া হচ্ছে না। তাছাড়া যাত্রায় লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো যাত্রী না নিতে চাইলে তাকে বোট নেবে না। তবে এ ব্যাপারে বোট সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থাকলে সেটিও আমরা দেখবো।
বিআইডব্লিউটিএর নগরবাড়ি-কাজীরহাট ঘাট কার্যালয়ের পোর্ট অফিসার আব্দুল ওয়াকিল জানান, অতিরিক্ত ভাড়া নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাড়ার সঙ্গেই সবকিছু, এখানে আলাদা করে ঘাটে প্রবেশ ফি নেওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে শিগগিরিই ভাড়া বেধে দেওয়া হবে এবং অন্যান্য যা জটিলতা রয়েছে সেগুলো নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাবনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম বলেন, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে এরইমধ্যে আমরা একটি সমন্বিত সভা করেছি। সেখানে যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ঘাটের সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতের ব্যাপারেও আলাপ হয়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। কারণ এটি মন্ত্রণালয়ের কাজ। তাই বলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রসঙ্গত ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর ও সময় বাঁচানোর লক্ষ্যে ২০১৬ সালের দিকে কাজীরহাট-আরিচা নৌরুটে লঞ্চ ও ফেরির পাশাপাশি স্পিডবোট চলাচল শুরু হয়। সাধারণত ১৩ ও গ্রীষ্মকালে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরত্বের এই নৌপথে ৪টি ফেরি ও ৯টি লঞ্চ চলাচল করে। এর সঙ্গে বর্তমানে ১২ সিটের ১১৯টি স্পিডবোট চলে দুই পাড়ে (আরিচা ও কাজিরহাট)। এতে করে এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের জলপথ পাড়ি দেওয়া যায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটে। এ কারণে প্রতিদিন হাজারেরও অধিক মানুষ যাতায়াত করেন স্পিডবোটে। ঈদের সময় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। সড়কপথে ঢাকার সঙ্গে পাবনার দূরত্ব ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার। যানজটের কবলে পড়লে লাগতে পারে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা সময়। সেখানে কাজিরহাট-আরিচা নৌপথে ঢাকা যেতে সময় লাগে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। দীর্ঘ সময় ক্লান্তির যাত্রায় ভোগান্তি কমাতে মানুষ এই নৌপথ বেছে নেন।
এফএ/এমএস