মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সহকারী পরিচালক’ (২০২৫ ব্যাচ) পদে প্রথম হয়েছেন। তিনি কুড়িগ্রামের রাজিবপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পান। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পান। এরপর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) ভর্তি হন। এখানে ওয়েট প্রসেসিং ডিপার্টমেন্ট থেকে ২০১৮ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
Advertisement
তার বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম হওয়ার গল্প ও নতুনদের পরামর্শ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম—
জাগো নিউজ: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে চানতে চাই—মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: আমার শৈশব কেটেছে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলায়। সোনাভরি নদীর তীরবর্তী কলেজপাড়া গ্রামকে কেন্দ্র করেই আমার সোনালি শৈশবের সমস্ত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি হওয়ায় পড়াশোনার জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হতো। ছোটবেলায় দেখতাম আব্বু হাতের কাছে বই পেলেই পড়তে শুরু করতেন। যা দেখে তখন থেকেই আমার বইপড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। পরে বইপড়া ভালো অভ্যাসে পরিণত হয়। আম্মু সব সময় চাইতেন মেয়ে যেন ভালো কিছু করতে পারে। শৈশবে আকাশে বিমান উড়ে যাওয়া দেখে খুব ইচ্ছে হতো পাইলট হওয়ার। সময়ের সাথে সাথে সুপ্ত সে ইচ্ছেটা অর্পূণই রয়ে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক নানা টানাপোড়েনের মাঝেই বেড়ে ওঠা। স্রষ্টার অনুগ্রহে বাবা-মায়ের সর্বাত্মক সহযোগিতায় সেসব চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পেরেছি।
জাগো নিউজ: পড়াশোনাকালে কী ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রম বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: স্কুলজীবনে নাটক, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা ও বির্তক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত মুখ ছিলাম। পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে খুব বেশি সক্রিয় থাকতে পারিনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বির্তক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি।
Advertisement
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে টেক্সটাইল সেক্টরে প্রায় এক বছর চাকরি করি। পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করি। আমার স্বামী বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তিনি আমাকে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিলেও প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিইনি। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাই উপভোগ করছিলাম। মূলত করোনা সংকটকালীন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদটিই আমার প্রথম পছন্দ ছিল।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার গল্প শুনতে চাই—মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে পরপর দুইবার ভাইভা দিয়ে অকৃতর্কায হওয়ার পর অনেকটা হতাশ হয়ে পড়ি। তৃতীয়বার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো মানসিক শক্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমার স্বপ্নটা অধরাই থেকে যাবে। তবে আমার স্বামী নতুন করে শুরু করতে উৎসাহ দেন। বেশ সময় নিয়ে কোথায় ঘাটতি আছে, তা খুঁজে বের করি। অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ থেকে প্রথম দুইবারই লিখিত পরীক্ষায় গণিতে ভুল করি। এ ছাড়া ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং তেমন মানসম্মত ছিল না বলেই মনে হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার জন্য পড়লেও নিয়মিত লেখার অভ্যাস ছিল না। তাই শূন্য থেকেই সব শুরু করি। প্রিলির প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন দ্রুত গণিত সমাধানের জন্য অনুশীলন করি। ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ে ভালো করার জন্য প্রথমে সারাদিনের নানা ঘটনা ইংরেজিতে লিখতে থাকি। এ ছাড়া কুইলবটে গ্রামার চেক, প্যারাফ্রেজ করে লেখার মান যাচাই করি। এরপর সাম্প্রতিক ঘটনার ওপর লিখতে শুরু করি। লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রিলির সময়ই ইংরেজিতে সাধারণ জ্ঞানের প্রস্তুতি নিই। এবারের লিখিত পরীক্ষায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। সৃষ্টিকর্তা এবার আর নিরাশ করেননি।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক পদে প্রথম হয়েছেন, অনুভূতি কেমন?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি! রেজাল্ট দিয়েছে শুনে ভেবেছি রেজাল্ট শিটের শেষ থেকে রোল খুঁজে দেখব। কিন্তু প্রথমেই নিজের রোল দেখে চমকে উঠি। অ্যাডমিট কার্ডের সাথে বারবার মিলিয়ে দেখছিলাম। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ভাবছি একি স্বপ্ন দেখছি, নাকি স্বপ্নের বাস্তবায়ন! সৃষ্টির্কতাকে শুকরিয়া জানিয়ে পরিবারের সবাইকে চাকরি পাওয়ার সুসংবাদ জানালাম।
আরও পড়ুন বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পেতে যা করবেন জানার জন্য প্রচুর পড়তে হবে, মুখস্থ করার জন্য নয়জাগো নিউজ: আড়াল থেকে সব সময় কারা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: এ দীর্ঘ যাত্রায় মা-বাবা ও আমার স্বামীকে সব সময় পাশে পেয়েছি। চর রাজিবপুর উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অংশ হওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস তারাই জুগিয়েছেন। পাশাপাশি আমার সব আত্মীয় ও শিক্ষকের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।
Advertisement
জাগো নিউজ: কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: পরপর দুইবার অকৃতর্কায হওয়ায় বেশ মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি চাকরিপ্রাপ্তির দীর্ঘসূত্র আমার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে দেয়। ভাইভার ঠিক এক মাস আগে পারিবারিক জীবনে অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনার সম্মুখীন হই। আমার একমাত্র সন্তান ২২ দিন বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভাইভার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না। জীবনের কঠিন এ সময়ে স্বামী ও দুই পরিবারের সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। আমার এ ছোট্ট অর্জন সন্তানকে উৎসর্গ করলাম।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পেতে নতুনরা কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: প্রস্তুতির কৌশল আসলে সম্পূর্ণ নিজের মতো ঠিক করতে হবে। গ্রুপ স্ট্যাডি অনেকের জন্য খুব কার্যকর হয়। আবার অনেকে একাকী পড়াশোনা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিজের দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটা বিষয়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে। আমি ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ে বেশি সময় দিয়েছি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিতে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা চূড়ান্তভাবে চাকরি প্রাপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই প্রিলির পাশাপাশি একই সাথে লিখিতের প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলা ও ইংরেজিতে নিয়মিত দুই বা তিন পৃষ্ঠা লেখার অভ্যাস করতে হবে। আর্গুমেন্ট রাইটিংয়ের ক্ষেত্রে অনলাইন থেকে সংগ্রহকৃত আইইএলটিএস ব্যান্ড স্কোর ৮/৮.৫ পাওয়া রাইটিংসগুলো আমার ফ্রি হ্যান্ড রাইটিংয়ে দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করেছিল। নিয়মিত অন্তত একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে সব কিছু সুন্দর করে খাতায় উপস্থাপন করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মাথা ঠান্ডা রেখে দ্রুত সময়ে সব উত্তর করতে হবে। এ জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করে ফোকাস, আর্গুমেন্ট, প্যাসেজ ইত্যাদি বাসায় লিখে অনুশীলন করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত গণিত সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।
জাগো নিউজ: এই পেশায় থেকে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস: স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের একজন হতে পেরে অসম্ভব ভালো লাগা কাজ করছে। সেই সাথে কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্ববোধ আরও বেড়ে গেল। একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে সচেষ্ট থাকব। বাংলাদেশ ব্যাংকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। উচ্চশিক্ষার সেসব সুযোগ গ্রহণ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করার চেষ্টা করব।
এসইউ/জিকেএস