আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে কিডনি বিক্রি করছে সাধারণ মানুষ

মিয়ানমারে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে বেশ বিপাকে পড়েছেন সেখানকার সাধারণ নাগরিকরা। বেঁচে থাকার মতো সামান্য অর্থও তাদের হাতে নেই। একটু মাথা গোজার ঠাঁই আর সামান্য খাবারের জন্য অনেকেই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রির চিন্তা করছেন। দেশটিতে কৃষিকাজ করেন জেয়া। তিনি বলেন, আমি শুধু থাকার জন্য একটি ঘর আর আমার ঋণ পরিশোধ করতে চাচ্ছিলাম। সে কারণেই আমি আমার কিডনি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেই।

Advertisement

বিবিসির এক প্রতিবেদনে অবৈধভাবে কিডনি বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ সালে দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ ‍শুরু হয়। সবকিছুর দাম এখন হাতের নাগালের বাইরে। জেয়া জানিয়েছেন, জিনিসপত্রের দাম এত বেশি যে, তিনি তার পরিবারের সদস্যদের ‍মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না। তাকে ঋণ করে পরিবারের খরচ মেটাতে হচ্ছে।

জেয়ার পুরো পরিবার তার শাশুড়ির বাড়িতে থাকতেন। এটি একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। প্রধান শহর ইয়াঙ্গুন থেকে ওই গ্রামে যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট ঘরে থাকেন তারা। গ্রামের রাস্তা এখনও কাঁচা।জেয়া জানতে পারেন যে, তার আশপাশে কয়েকজন কিডনি বিক্রি করেছেন। তাদের দেখে তার কাছে সুস্থই মনে হয়েছিল বলে জানান তিনি।

এরপরেই তিনি নিজেও কিডনি বিক্রির উপায় খুঁজতে শুরু করেন। জেয়া জানান, তিনিসহ ৮ জন ভারতে গিয়ে কিডনি বিক্রি করেছেন। এশিয়াজুড়েই বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করা অবৈধ। মিয়ানমার এবং ভারতেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা বেআইনি।

Advertisement

জেয়া জানান, তিনি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এক ব্যক্তির সন্ধান পান, যাকে তিনি এই কাজের ‘দালাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওই ব্যক্তি জেয়ার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং কয়েক সপ্তাহ পর জানান, একজন সম্ভাব্য গ্রহীতা পাওয়া গেছে যিনি একজন বার্মিজ নারী। এরপর অস্ত্রোপচারের জন্য তাদের ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

ভারতে দাতা ও গ্রহীতা নিকটাত্মীয় না হলে প্রমাণ করতে হয় যে, মানবিক উদ্দেশ্যেই অঙ্গ দান করা হয়েছে। এসব নিয়ম এড়াতে দালাল একটি ভুয়া নথি তৈরি করেন। দালাল গ্রহীতার পারিবারিক নথিতে জেয়ার নাম ঢুকিয়ে দেন।

এরপর দালাল তাকে গ্রহীতার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য ইয়াঙ্গুনে নিয়ে যান। সেখানে এক ব্যক্তি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, জেয়া যদি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, তাহলে তাকে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে।

জেয়াকে জানানো হয়েছিল, অস্ত্রোপচারের বিনিময়ে তিনি ৭৫ লাখ মিয়ানমার কিয়াত (প্রায় ১৭০০ থেকে ২৭০০ মার্কিন ডলার) পাবেন। এরপর তিনি উত্তর ভারতে যান। সেখানে একটি বড় হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

Advertisement

জেয়া জানান, অস্ত্রোপচারের আগে কর্তৃপক্ষ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে তিনি স্বেচ্ছায় কিডনি দান করছেন কি না বা তাকে কোনও জোরজবরদস্তি করা হয়েছে কি না। তিনি তাদের জানান, গ্রহীতা তার আত্মীয়।

জেয়া জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পর তার বড় কোনো সমস্যা হয়নি, তবে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে তিনি সহজে নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। এরপর এক সপ্তাহ তিনি হাসপাতালে কাটিয়েছিলেন।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে বেকারত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি ভারতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রায় ১০ জনকে কিডনি কিনতে বা বিক্রি করতে সহায়তা করেছেন।

তিনি জানান, মধ্য মিয়ানমারের মান্দালয়ে একটি ‘এজেন্সি’র কাছে দাতাদের রেফার করতেন। তার ভাষায়, দাতাদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমাদের কাছে এমন দাতাদের তালিকা রয়েছে, যারা কিডনি দানের জন্য প্রস্তুত।

আরও পড়ুন: ভারতে ১০০ কোটি মানুষের বাড়তি খরচের ক্ষমতা নেই: রিপোর্ট বাংলাদেশের আদলে ভারতে চালু হচ্ছে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ মোদীর সামনেই ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রাম্পের

তিনি আরও জানান, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সম্পর্ক দেখানোর জন্য নথিপত্র জাল করা হতো যেখানে অপরিচিত ব্যক্তিদের বিবাহসূত্রে আত্মীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হত। তবে তিনি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তর দেননি।

টিটিএন