ফিচার

হারিয়ে যাওয়া ফলের ফিরে আসার অবিশ্বাস্য গল্প

সানজানা রহমান যুথী

Advertisement

আমরা প্রায়শই বিভিন্ন যাদুঘরে যাই। সেখানে আমরা শিল্পীদের নানান ধরনের চিত্রকর্ম দেখি। কিন্তু একটি চিত্রকর্ম দেখে আমরা কি ভাবি? পূর্বের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। এর বাইরে কি আমরা কোনো চিত্রকর্ম দেখে ভেবেছি যে এটি কি তাৎপর্য বহন করে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আমরা এর সঠিক উত্তর দিতে পারব না। কিন্তু একটি চিত্রকর্মও কৃষিক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া ফসলের প্রজাতি ফিরিয়ে আনতে পারে! কথাটা শুনতে কিছুটা অবিশ্বাস্য।

এমনি বিস্ময়কর কাজ করে দেখিয়েছেন ইতালির ইসাবেলা ডাল্লা রাগিওনে। ইসাবেলা একজন ইতালিয়ান উদ্ভিদ গবেষক, যিনি পুরোনো শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করে হারিয়ে যাওয়া ফল ও ফসল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। মূলত তিনি আর্কাইভ, রেনেসাঁস চিত্রকলা এবং ইতালির গ্রামীণ এলাকায় গাড়ি চালিয়ে বিলুপ্তপ্রায় ফলের সন্ধান করেন।

ইসাবেলা উম্ব্রিয়ার জাতীয় গ্যালারিতে ঘুরতে গিয়েছিলেন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে। সেখানেই পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কার আঁকা একটি চিত্রকর্মের উপর নজর পরে তার। যেখানে দেখা যাচ্ছে ম্যাডনা অর্থাৎ যিশুর মা ম্যারি গাঢ় নীল রঙের জামা পরে আছেন, কোলে ছোট্ট যিশু। তার হাতে দেখা যাচ্ছে কোন একটি ফল ধরে আছেন।

Advertisement

স্বচ্ছ মার্বেলের একটি ছোট ফলের থোকা। ইসাবেলার নজরে পড়ে সেই ফলের দিকে। তিনি বুঝতে পারেন এটি অ্যাকুয়াইওলা চেরি। একসময় ইতালিতে এই জাতের চেরি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত, কিন্তু এখন প্রায় বিলুপ্ত। এই ফলটিকে খ্রিস্টের রক্তের প্রতীক হিসেবে দেখা হত সেসময়।

এছাড়া আরেকটি ছবিতে মেরির যিশুকে কোলে নিয়ে আছেন, তার সামনেই রাখা একটি নাশপাতির মতো দেখতে একটি ফল। তবে ইসাবেলা বলেন এটি নাশপাতি নয়, আপেল। আপেলের অদ্ভুত আকৃতির জাত, যা বর্তমানে বাজারে দেখতে পাওয়া যায় না। এই জাতের আপেল ষোড়শ শতাব্দীতে ব্যাপকভাবে চাষ করা হত। ২১ শতকের মধ্যে মূলত বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কারণ ইতালির সব প্রধান ফল গাছের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে।

এই ফলগুলো আবার তিনি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। নিজের বাগানেই বিভিন্ন হারিয়ে যাওয়া ফলগুলোর বীজ বপন করে তা থেকে গাছ তৈরি করছেন। তিনি আশা করেন এসব হারিয়ে যাওয়া ফল তিনি আবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন। ৬৭ বছর বয়সী ইসাবেলা ডালা রাগিওনের কাজ আমাদের শেখায়, শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিকতার প্রতিফলন নয়, বরং এটি আমাদের অতীতের এক মূল্যবান তথ্যভাণ্ডার।

ইসাবেলা ডাল্লা রাজিওনে পেরুজিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, পাশাপাশি বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে থিয়েটার ও অভিনয় অধ্যয়ন করেন। এমনকি তিনি প্যারিসের একটি বিখ্যাত ক্লাউন স্কুলের শিক্ষকের কাছেও কোর্স করেছিলেন।

Advertisement

তিনি বলেন, ১৯৮০-এর দশকে তিনি দুটি পেশায় যুক্ত ছিলেন যা, একটি থিয়েটারে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে এবং অন্যটি কৃষিবিদ হিসেবে মাঠে। তখন ইতালিতে এবং সারা বিশ্বে শিল্পায়িত কৃষির উত্থান কৃষির বৈচিত্র্যকে দ্রুত হ্রাস করেছিল। ব্যাপক আকারে চাষযোগ্য সাধারণ বীজ বিশেষ অঞ্চলের অভিযোজিত জাতগুলোর জায়গা দখল করছিল। ফলে স্থানীয় ফলের জাতগুলো বাজার এবং কৃষিক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে হাজার হাজার স্থানীয় কৃষক তাদের জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় ।

তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তার দেশের হারিয়ে যাওয়া ফলসমূহ নিয়ে কাজ করবেন। শুরুর দিকে, তিনি তার বাবার সঙ্গে স্থানীয় কৃষকদের সাক্ষাৎকার নিতে যেতেন, যেখানে তারা হারিয়ে যাওয়া এবং বিলুপ্তপ্রায় ফলের জাতগুলোর সম্পর্কে জানতেন। তিনি বলেন, এটি আমার জন্য এক ধরনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল, কিছুটা বিনোদনের মতো।

ইসাবেলার আর্কিওলজিয়া আরবোরিয়া নামে একটি অলাভজনক সংস্থা আছে। যেখানে তিনি পৃথিবীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ফল সংরক্ষণে কৃষক ও সরকারকে সহযোগিতা করেন। তার এই বিস্ময়কর কাজের জন্য তাকে ‘ফল গোয়েন্দা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।কিন্তু তিনি নিজেকে একজন ‘গাছবিশেষজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদ’ বলে অভিহিত করেন।

কারণ তার মতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা যেমন প্রাচীনকালের বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণা করেন, ঠিক তেমনি তিনিও প্রাচীনকালের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ফল পুনরুদ্ধারের কাজ করেন। তার লেখা একটি চমৎকার বই হলো ‘বৃক্ষীয় প্রত্নতত্ত্ব: দুই ফল অনুসন্ধানীর দিনলিপি’ যেখানে তিনি তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

প্রাচীনকালের চিত্রকর্ম ব্যবহার করে কীভাবে পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া ফলসমূহ ফিরিয়ে আনতে হয় তা ইসাবেলা ডালা রাগিওনে পৃথিবীতে করিয়ে দেখিয়েছেন। তার এই যাত্রা আমাদের অনুপ্রাণিত করে, যে প্রকৃতি ও ইতিহাসের সংযোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। যা আমাদের বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করবে বলে আশা করা যায়।

আরও পড়ুন মুক্তা চাষে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ঋতুর সঙ্গে শরীরের রং বদলায় যে শিয়াল

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

কেএসকে/এএসএম