প্রবাস

তিনি শুধু নোবেল বিজয়ী নন বরং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক

রাজনৈতিক সংকট ও পরিবর্তনের দাবি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। নেতৃত্বের অভাব, গণতন্ত্রের সংকট ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক আন্দোলন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ছাত্র ও যুব সমাজের প্রতিবাদ পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে, যা শুধু শাসকগোষ্ঠী নয়, আন্তর্জাতিক মহলকেও ভাবাচ্ছে।

Advertisement

এই সংকটের মুহূর্তে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান গভীর তাৎপর্য বহন করছে। তিনি সরকার পরিচালনা করেন না, তবে তার আদর্শ, নীতি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের নীতিনির্ধারণে ছায়ার মতো উপস্থিত।

১. নোবেল বিজয়ী ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: আদর্শের শক্তি

ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের পথ দেখিয়েছেন এবং বৈশ্বিকভাবে মানবিক অর্থনীতির রূপকার হিসেবে পরিচিত। পাশ্চাত্যের কাছে তিনি শুধু একজন নোবেল বিজয়ী নন বরং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক।

তার প্রভাব তিনটি কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

Advertisement

• আন্তর্জাতিক মর্যাদা: বিশ্বমঞ্চে তার চিন্তাধারা ও কার্যক্রম প্রশংসিত, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে।• সরকারের বাইরে, কিন্তু প্রভাবের কেন্দ্রে: তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, তবুও তার নীতি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়।• মানবিক অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়: তার কাজ দেখিয়েছে যে প্রকৃত উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর সঙ্গে ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই কারণেই বলা হয়—‘ড. ইউনূসের সরকার নেই,’ তবে তার চিন্তাধারা বহু নীতিতে কার্যকর হয়।

২. বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও পরিবর্তনের দাবি

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু শক্তির রাজনীতি নয় বরং আদর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

• অগণতান্ত্রিক শাসনের উত্থান: দমনমূলক নীতির ফলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে, যা সামাজিক অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

Advertisement

• নেতৃত্বের সংকট: রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, তখন এটি প্রমাণ করে যে টিকে থাকার জন্য নৈতিকতা ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য।

• ছাত্র ও যুব সমাজের বিদ্রোহ: পরিবর্তনের দাবিতে তরুণ সমাজ সোচ্চার হচ্ছে, যা নেতৃত্বের শূন্যতার প্রতিফলন।এই বাস্তবতায়, ড. ইউনূসের মতো একজন নৈতিক ও মানবিক অর্থনীতির প্রবক্তা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠছেন।

৩. আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব: নেতৃত্ব বনাম উপদেষ্টাদের ব্যর্থতা

ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি একজন মানবিক নেতা হিসেবে দৃঢ় হলেও, তার উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ মহলের কিছু ব্যর্থতা তাকে প্রত্যাশিত প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ করেছে।

• আদর্শের পৃষ্ঠপোষকতা: তিনি মানবিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রতীক হলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে।• উপদেষ্টা দলের অক্ষমতা: তাঁর উপদেষ্টাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তির দুর্বল নেতৃত্ব ও কার্যকর কৌশলের অভাব জনগণের আস্থার সংকট তৈরি করছে।• জনমতের দ্বিধা: একদিকে জনগণ তার নীতির প্রতি আগ্রহী, অন্যদিকে তার আশপাশের মানুষের প্রশাসনিক দুর্বলতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ফলে, আদর্শের চাহিদা থাকলেও, নেতৃত্ব ও পরিচালনার দক্ষতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

৪. আদর্শের পুনর্জাগরণ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ড. ইউনূস সরাসরি সরকার পরিচালনা করেন কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তবে তার নীতি ও আদর্শ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলছে। তার উপদেষ্টা পরিষদ, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসন যে ভূমিকা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল বা তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়াই তার প্রত্যাশিত প্রভাব বিস্তারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার ভূমিকা প্রশ্নাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন চিকিৎসক ও পেশাগত দক্ষতার উন্নয়নে দরকার পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থা  মোদের গরব, মোদের আশা, আ’মরি বাংলা ভাষা  আগে নিজের সংশোধন তারপর দেশ  দেশ পরিচালনায় তার নীরবতা কিছু ইঙ্গিত দেয়—

• গণতান্ত্রিক ও সামাজিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি: রাজনৈতিক সংকটের সমাধান শুধু শক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয় বরং আদর্শ, নৈতিকতা ও মানবিক নেতৃত্বের সমন্বয় প্রয়োজন।

• আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা: ক্ষমতার পরিবর্তে নীতি ও ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বই টেকসই পরিবর্তনের চাবিকাঠি।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়— ‘জনগণের রাজনীতি হবে, না কি রাজনীতির জনগণ থাকবে?’

যতদিন জনগণ রাজনীতিকে নিজেদের অধিকার হিসেবে দেখবে না, ততদিন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি চলতেই থাকবে। তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, কারণ নতুন প্রজন্ম গণতন্ত্র ও আদর্শিক নেতৃত্বের দাবি তুলছে।

সত্যিকার পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন জনগণ কেবল ভোটের সময় ব্যবহৃত হবে না, বরং রাজনীতির প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে।

অতএব, ড. ইউনূস সরকার পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন সত্ত্বেও, তার নীতি ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র ও সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে— যদি প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক দল তাদের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বিতভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। দেশের ভবিষ্যৎ এখন আদর্শ ও বাস্তবতার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করার ওপর নির্ভর করছে, যেখানে নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার নয় বরং ন্যায়, নৈতিকতা ও জনকল্যাণের প্রতিফলন হবে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক(সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন)Rahman.Mridha@gmail.com

এমআরএম/জিকেএস