ফিচার

প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে দিনমজুর জয়নালের পাঠাগার

প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে দিনমজুর জয়নালের পাঠাগার

মোহাম্মদ সোহেল রানা

Advertisement

জয়নাল আবেদীন বয়স ৩৪ বছর। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়া হয়নি তার। চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই হওয়ার কারণে কিশোর বয়সেই সংসারের বোঝা পড়ে তার কাঁধে। তাই পূর্বপুরুষদের মতোই দিনমজুরি শুরু করেন। তবে সে অন্য ১০ জন সাধারণ দিনমজুরের থেকে ব্যতিক্রম একজন মানুষ।

শৈশবের পড়াশোনা বেশি করতে না পারলেও বই পড়ার প্রতি তার আলাদা নেশা রয়েছে। সেই নেশা থেকেই অভাবের সংসারের মাঝেই ‘সাতভিটা গ্রন্থনীড়’ নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে চার হাজারের অধিক বই রয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে জয়নালের এই পাঠাগার।

সম্প্রতি জয়নাল আবেদীন তার পাঠাগারের সেই যাত্রার গল্প এবং বর্তমান কেমন চলছে তা নিয়ে জাগোনিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ সোহেল রানা-

Advertisement

জয়নাল আবেদীন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সাতভিটা গ্রামে দিনমজুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জেলা শহর থেকে এই গ্রামের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের বেশি। যেখানে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের শিকার দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বেশি। সেই হিসেবে শিক্ষার হার একদম কম। গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে আধপাকা ঘরটা। হালকা নীল রঙের দেয়াল। সেই ঘরটাই গ্রন্থনীড় পাঠাগার। ঘরে বড় একটি টেবিল। পাশে চেয়ার ও বেঞ্চ। কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই। দেয়ালে টানানো আছে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি।

জাগোনিউজ: কীভাবে পাঠাগার করার ব্যাপার মাথায় আসলো?জয়নাল আবেদীন: বছরের যে সময়ে গ্রামে কাজ থাকে না, তখন কাজের জন্য গাজীপুরে যান জয়নাল আবেদীন। ওখানে গিয়ে প্রথমবারই ইটভাটায় কাজ পেয়ে যান তিনি। এরপর থেকেই গাজীপুর গেলেই ইটভাটাতেই কাজ করেন। ভাটার কাজ মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় সকালে। তাই দুপুরে কোনো কাজ না থাকায় প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে বিকেলে আশপাশের বাজারে আড্ডা দিতেন জয়নাল।

২০১১ সালের কোনো একদিন ভাটার কাজ শেষে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এ সময় ফুটপাতে বইয়ের দোকান দেখে তার ভালো লাগে। পরে বইগুলোর দাম কম হওয়ার কারণে দুটি বই কিনেন জয়নাল। পরে কাজ শেষে অবসরে বই পড়েন। এতে ধীরে ধীরে বই পড়ার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এরপর কাজের জন্য গাজীপুর গেলেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন, টঙ্গী কলেজ গেট থেকে পুরোনো বই কেনেন। ইটভাটায় কাজে যে টাকা পান, সেখান থেকে কিছু টাকা জমিয়ে এসব বই কিনতেন। এভাবে বাড়তে থাকে বইয়ের সংগ্রহ। হুট করে গ্রামে পাঠাগার করার চিন্তা মাথায় আসে। গ্রামের সবাইকে বই পড়াবেন।

জাগোনিউজ: এরপরে কীভাবে পাঠাগারের যাত্রা করলেন?জয়নাল আবেদীন: সেই চিন্তা থেকেই কাজ শেষে গ্রামে ফিরে আসলেন জয়নাল। পরে পাঠাগারের বিষয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বললেন। অনেকেই তার এমন প্রস্তাবে রাজি। গ্রামে একটি পরিত্যক্ত জায়গায় ঘর তোলার সিদ্ধান্ত হলো। যারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা সবাই জয়নালের মতো খেটে খাওয়া দিনমজুর। পরে টাকা জমিয়ে এবং সবার সহায়তা টিনের চালা, ছোট একটি বই রাখার র্যাক, কয়েকটা চেয়ার ও একটি টেবিলও বানান। পাঠাগারের নাম দেন ‘সাতভিটা গ্রন্থনীড়’। ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর পাঠাগারের উদ্বোধন হয়।

Advertisement

দিন দিন বাড়তে থাকে বই ও পাঠকের সংখ্যা। তখন বইয়ের সংখ্যা ২০০। সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল পাঠাগার। তবে ২০১৩ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রামে সংঘর্ষ হয়। একজন মারাও যায়। এ ঘটনায় এলাকায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়লে পাঠাগারটিও বন্ধ হয়ে যায়। এতে তিনি অনেকটা হতাশায় পড়ে যান। পরে বাধ্য হয়ে সাত মাস পর র্যাকসহ বই অন্য একটি পাঠাগারে দিয়ে দেন জয়নাল। পাঠাগার বন্ধ হওয়ার পর আবার চলে আসেন গাজীপুরে। তবে কাজের মাঝে সেই পাঠাগারের কথা তার মনে পড়ে।

এদিকে নতুন পাঠাগার করার চিন্তা নিয়ে গাজীপুর থেকে কয়েক মাস কাজ করে বাড়িতে ফিরে আসেন জয়নাল। আবার শুরু করেন বই সংগ্রহ। এবার নিজের থাকার ঘরের একটি অংশে বই জমান। পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই পৌঁছে দেন। পড়া শেষ হলে নিজেই আবার সংগ্রহ করে আনেন।

জাগোনিউজ: নতুন করে আবার কীভাবে পাঠাগার করলেন?জয়নাল আবেদীন: ২০১৫ সালের দিকে পাঠাগারের জন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে এক শতাংশ জমি ২০ হাজার টাকায় নেন তিনি। কথা হয় প্রতি মাসে এক হাজার করে টাকা দিয়ে জমির দাম শোধ করবেন জয়নাল। এতেই রাজিও হন জমির মালিক। ২০১৯ সালে জমির দাম পরিশোধ করেন তিনি। পরে বন্ধু ও পাঠকদের সহায়তা জমিতে মাটি ভরাট করেন। টিনে ঘর তুলে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কেনার পরে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে পাঠাগার চালু করেন।

জাগোনিউজ: বর্তমানে এই পাঠাগারের পাকাঘর কীভাবে করলেন এবং এত আসবাবপত্র?জয়নাল আবেদীন: পাঠাগারের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে জানতে পারেন সেই সময়ের সরকারের যুগ্ম সচিব এনামুল হাবীব। তখন তিনি এলজিএসপি বিভাগের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে আধা পাকা ঘর, আসবাব, কিছু বই, চেয়ার-টেবিল তৈরি করে দেন তিনি। এরপর সেই বছরের ৬ অক্টোবর জয়নালের স্বপ্নের গ্রন্থনীড় উদ্বোধন হয়। বর্তমানে এই পাঠাগারে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই সহ চার হাজারের অধিক বই রয়েছে। পাঠাগারে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন পাঠক বই পড়েন। এছাড়া মাসে বাড়িতে বই নিয়ে যান ২৫০-২৭০ জন পাঠক। এছাড়া নতুন করে আরও এক শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। পাঠাগারে একটি কম্পিউটারও রয়েছে। শিশুদের জন্য খেলার ব্যবস্থাও আছে।

জাগোনিউজ: এই পাঠাগার করতে গিয়ে কী ধরনের বাঁধার মুখে পড়েছেন?জয়নাল আবেদীন: পাঠাগারের জন্য জমি কেনার কথা গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেই সমালোচনা শুরু হয়। তার কাজকে কেউ বলতে থাকে ‘পাগলামি’, কেউ বলে ‘গরিবের ঘোড়ারোগ!’ তিনি অনেকের তিরস্কার সহ্য করেছেন। তবুও পাঠাগার গড়ার সেই স্বপ্ন থামিয়ে রাখেন নাই এ যুবক। আর সেই জেদ থেকেই আল্লাহর রহমত ও সবার সহায়তায় আজ একটি পরিপূর্ণ পাঠাগার করতে পেরেছি।

জাগোনিউজ: বর্তমানে আপনি কোথায় কাজ করছেন?জয়নাল আবেদীন: পাঠাগার চালুর পর থেকে এলাকাতেই জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। এছাড়া মৌসুমী ধানের ব্যবসা করেন। সপ্তাহে সাতদিনই বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। নিজেই সেই দায়িত্ব পালন করেন জয়নাল। এছাড়া সপ্তাহে একদিন এলাকার হাই স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য বই নিয়ে যান। এলাকার বাইরে না যাওয়ার কারণে আয় কম হলেও এতেই খুশি জয়নাল।

জাগোনিউজ: পাঠাগার নিয়ে ভবিষ্যত স্বপ্ন কী আপনার?জয়নাল আবেদীন: গ্রন্থাগার নিয়ে অনেক স্বপ্ন, নিজ এলাকা ছাড়াও সবার মাঝে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে চান। তাই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বই পরিচিত নামে প্রোগামও করেন। এছাড়া একটা আলোর স্কুল ও বিজ্ঞান ক্লাব করারও চিন্তা আছে জয়নালের।’

অন্যদিকে জয়নাল পৈতৃক সূত্রে বসতভিটার ২ শতাংশ জমি পেয়েছেন। এটাই তার একমাত্র সম্পদ। যেখানে ২টি টিনশেড ঘর রয়েছে। এর একটিতে থাকেন তার বৃদ্ধা মা। অন্যটিকে জয়নাল, তার স্ত্রী ও ৫ বছরের সন্তান থাকেন।

আরও পড়ুন গ্রন্থাগার: হারানো স্বপ্নের আলোতে জ্ঞান অন্বেষণ বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ৫ জনের জীবন কেমন ছিল

লেখক- শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যকর্মী।

কেএসকে/এএসএম